সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার, খালেদা শাহরিয়ার কবির ডোরা ২১ জানুয়ারী ২০২১ সালে কোবিদ-১৯ আক্রান্ত হয়ে ঢাকা শহরের এক হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহে। .....রাজেউন)। মৃত্যুকালে মরহুমার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
২০১৯ সনে বুয়েট এলামনাই সভাপতি ডঃ দেলোয়ার হোসাইন ডোরাকে BUET Alumni র বাৎসরিক পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আমন্ত্রণ জানানোর দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি রাজীও হয়েছিলেন কিন্তু কোবিদ-১৯ সে সুযোগ দিলো না। সবাইকে বিদায় জানিয়ে ডোরা চলে গেলেন, না ফেরার দেশে। ডোরার মৃত্যুতে দেশ একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার তথা পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ হারালো। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ছয় দশক আগে(১৯৬৩-৬৪ সাল) বুয়েট এর দুয়ার ‘অলিখিতভাবে’ মেয়েদের পড়াশোনার জন্য বন্ধ ছিল। তিনজন তরুণী বিজ্ঞানী কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সেই রুদ্দ্ব দুয়ার খুলে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে আজ বুয়েট এ প্রচুর তরুণী শিক্ষার্থী দেখতে পাই। সেদিনের আলোচনা টেবিলে প্রয়াত ডোরা মুখ্য ভূমিকা পালন করে নিজের জন্য আলাদা স্থান করে গেছেন।

পৈতৃক নিবাস গাইবান্ধা জেলায় কিন্তু ডোরার জন্ম ঢাকা শহরে ১৯৪৬ সালের ৮ই নভেম্বর। ডোরার পিতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় জনাব কবীরুদ্দিন বুয়েট এর প্রফেসর ও ডিরেক্টর অফ স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ছিলেন।.আট ভাইবোনের মধ্যে ডোরা ছিলেন ৩য় সন্তান। পুরোনো ঢাকার বকশি বাজার এলাকার নাজিমুদ্দিন রোডস্থ ইসলামিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এ পড়াশুনা করে ১৯৬২ সালে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। তারপর উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সনদ লাভ করেন ইডেন গার্লস কলেজ থেকে। উভয় পরীক্ষাতেই মেধা বৃত্তি পেয়েছিলেন। প্রয়াত ডোরা ১৯৬৮ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিগ্রী লাভের পর ১৯৭৫ সালে Asian Institute of Technology থেকে মাস্টার্স করেছেন।
বাবা ইঞ্জিনিয়ার ও বড় ভগ্নিপতি শাইখ শহীদুল্লাহ(আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ১৯৫৮ গ্রাজুয়েট ও শহীদুল্লাহ এসোসিয়েটস এমডি) বুয়েট এর ইতিহাসে সর্বপ্রথম অনার্সপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার। ইডেন গার্লস কলেজে HSC পড়া কালীন (১৯৬৩ সাল) ডোরার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আগ্রহ জাগে। বান্ধবীদের কাছে তার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। তারা হেসে উড়িয়ে দিতেন। কারণ সে সময়টাতে মেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতো না। ১৯৬৪ সালের গোড়ার দিক পৰ্যন্ত কেবল দুজন সমমনা পেলেন এবং যথারীতি ভর্তি পরীক্ষার জন্য ফর্ম জমা দিলেন। অভিজ্ঞ শিক্ষক ও সর্ব মহলে শ্রদ্ধাভাজন ডঃ রশিদ ছিলেন ভাইস চ্যান্সেলর। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করে ডঃ রশিদ ভর্তি পরীক্ষায় মেয়েদের এলাও করতে রাজি হননি। কিন্তু ডোরা ও বান্ধবীদ্বয় ছিলেন নাছোড়বান্দা। তারা যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে মেয়েরা কম মেধাসম্পন্ন নয় এবং মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াটা দেশের সংবিধান পরিপন্থী ও নয়। ডঃ রশিদ ছোট বেলা থেকে ডোরাকে দেখেছেন ও স্নেহ করতেন। কয়েক দফা বৈঠকের পর ডঃ রশিদ রাজি হলেন। ডোরা ও তার বান্ধবীদ্বয় যথরীতি পরীক্ষা দিয়ে মেধার ভিত্তিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেলেন। ডঃ রশিদ একটাই মাত্র কন্ডিশন দিয়েছিলেন (বাইরে সার্ভে করতে হয় বলে) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ার জন্য। সেটাও তিনি পরে শিথিল করে ছিলেন।
বুয়েট থেকে পাস্ করার পর ডোরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পা উ বি)র চাকুরী বেছে নিয়েছিলেন এবং স্ট্রাকচারাল বিভাগের দায়িত্বে থাকার পর অতিরিক্ত ডিজি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ডোরার স্বামী আমিনুর রহমান সিভিল ইঞ্জিনিয়ার (১৯৬৭ ব্যাচ)। খুব সুখী দম্পতি ছিলেন । ২০১৪ সালে আমিন ভাই মৃত্যু বরন করলে ডোরা ভেঙে পড়েন। ওদের এক মাত্র মেয়ে ক্যালিফোর্নিয়াতে কোনো ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। ব্যাক্তিগত জীবনে খুবই ধার্মিক ছিলেন। সাধাসিধে জীবন যাপন করতেন। ক্লাসমেট, সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার সবার প্রিয় ছিলেন। শিক্ষকগণ ওকে দারুন আদর করতেন।
ইঞ্জিনিয়ার ডোরা IEB র সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পা উঃ বি Alumni Association এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। সেমিনার করেছেন। সামাজিক সংগঠনের সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত ছিলেন। সংবাদপত্র/টিভি তে ইন্টারভিউ প্রদান করেছেন। অনেক সম্মাননা ও পদক লাভ করেন। ডোরার প্রয়াত আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদৌস প্রদান করুন। আমীন। নিচে কিছু ছবি দেয়া হলো।
Comments 0
No comments yet. Be the first to comment!
Sign in to leave a comment.