আশির দশকের প্রথম দিকের কথা। শীতের সকাল—বুয়েটের তিতুমীর হলের ক্যান্টিনে (সে সময় “মোটু’র ক্যান্টিন” নামে খ্যাত—যেখানে দুই-আড়াই টাকায় সকালের নাস্তা আর চার-পাঁচ টাকায় পেট ভরে দুপুরের খাওয়া হতো) দ্রুত নাস্তা সেরে—দুটো পরোটা, ডিমভাজি, বুটের ডাল আর এক কাপ চা—তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে রওনা হলাম পল্টনের পাশে বঙ্গবাজার কিংবা নিক্সন মার্কেটের দিকে। তিতুমীর হলের আমরা তিন বন্ধু।
নিক্সন মার্কেট তখন আমাদের মতো মফস্বল থেকে আসা মধ্যবিত্ত ছাত্রদের জন্য ছিল এক বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। কারণ কম দামে ইউরোপ–আমেরিকা থেকে আসা সামান্য ব্যবহৃত, পালিশ করা দারুণ সব শার্ট–প্যান্ট, জ্যাকেট—সব ধরনের বিদেশি কাপড়চোপড় পাওয়া যেত।
আমার দুই বন্ধু—দুজনে যন্ত্রকৌশলের ছাত্র, ভীষণ ঘনিষ্ঠ, দুজনেরই বাড়ি উত্তরবঙ্গে। মার্কেটে ঢুকেই দারুণ আগ্রহ নিয়ে খুঁজতে শুরু করলাম শার্ট–প্যান্ট। অনেকক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করেও কোনো পছন্দের জিনিস না পেয়ে ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ফেরার চিন্তা করছি—ঠিক তখনই সামনের দোকানে দুজনের চোখ একসঙ্গে আটকে গেল একটি লাল শার্টের দিকে।

চোখের পলকে দেখি দুজনের হাতেই একই শার্ট। একেবারে নতুন, চকচকে লাল রঙের শার্ট। দুজনেরই সাইজের সঙ্গে মেলে, দুজনেই কিনতে চায়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি না—“আমার চাই!”, “না, আমার চাই!”—কেউ হারতে নারাজ। দুজনেরই ফরসা মুখ রাগে লাল। চারদিকে লোকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আমাদের সে দিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। দোকানে দ্বিতীয় শার্ট নেই—তাই দুজনেই টানাটানি করছে একই লাল শার্ট নিয়ে।
এক পর্যায়ে রাগে গজগজ করতে করতে বন্ধু বলল, “তুই নে!”—এবং তিতুমীর হলের আরেক বন্ধু পিয়ূষকে (এখন কানাডাবাসী) নিয়ে দ্রুত চলে গেল।
মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কী করব বুঝতে না পেরে দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম দাম কত—দাম শুনে আতকে উঠলাম—পঞ্চাশ টাকা! মনে মনে হিসাব করলাম—এত টাকা কি পকেটে আছে? বুয়েটের ছাত্ররা টিউশন করে অনেকেই উপার্জন করত, কিন্তু তখনো আমি টিউশন শুরু করিনি। ভীষন ভাবে অনুভব করলাম একটা টিউশনী শুরু করার কথা। বাবার পাঠানো মাসিক চারশ টাকায় কোনোরকমে চলি।
মনে পড়ল তিতুমীর হলের বন্ধু মির্জার কথা—সবে মাত্র একটা কোচিং সেন্টার খুলেছে, পরে যেটি Sunrise নামে দেশের অন্যতম সফল কোচিং সেন্টার হয়েছে।
যাক, পকেট হাতড়ে দেখলাম পঞ্চান্ন টাকা আছে—যা দিয়ে সেই সময় পুরান ঢাকায় গিয়ে সাত প্লেট সুস্বাদু হাজীর বিরিয়ানি খাওয়া যেত! কিন্তু মন ঠিক হয়ে গেছে—শার্টটা আমি নেবই।
শার্টটি কিনে তিন টাকা দিয়ে একটা রিকশা নিয়ে হলে ফিরলাম। হলের উত্তর ব্লকে বন্ধু মুন্নুর রুমে ঢুকে শার্টটি এগিয়ে দিয়ে বললাম—“দোস্ত, এটা তোর জন্য এনেছি।” বন্ধু বিব্রত হয়ে দাম দিতে চাইলো। আমি বললাম—“না দোস্ত, এটা তোর জন্য একটা গিফট। তুই আমার থেকেও ফর্সা—এটা পরলে তোকে খুব ভাল লাগবে।”
মাঝেমধ্যে বন্ধুকে শার্টটি পরে থাকতে দেখে আমার মনটাই ভরে যেত।
অনেক বছর পরে মুন্নুর ফোন—“লায়ন, আমি টরন্টো এসেছি।” মুন্নু তখন জাপান থেকে পিএইচডি করে ঢাকার একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত। কোম্পানির কাজে কানাডায় এসেছে। ফোন পেয়ে তিতুমীর হলের আরেক বন্ধু হিরনকে নিয়ে ছুটে গেলাম।
এখানে উল্লেখ্য, বন্ধু হিরন আর আমি প্রথম কানাডায় বুয়েটিয়ানদের একটি অ্যাসোসিয়েশনের কথা ভেবেছিলাম। পরে মনীষ পালসহ আমরা তিনজন ডিরেক্টর মিলে “BUET Alumni Association Canada” নামটি ঠিক করে নন-প্রফিট ইনকরপোরেশন হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করি। এখন এটি বুয়েটিয়ানদের এক মিলনমেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেখলে ভাল লাগে।
যাহোক—মুন্নুসহ তিন বন্ধু মিলে ডিনার করলাম। কত স্মৃতি রোমন্থন—তবুও মন ভরল না। তারপর সে কানাডা ছাড়ার আগে আবার দেখা করলাম। বিদায়ের সময় আবার লাল শার্টের প্রসঙ্গ উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম—“দোস্ত, লাল শার্টটা কোথায়?”
মুন্নু হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল—“জানিস দোস্ত, তোর লাল শার্টটা অনেক দিন ব্যবহার করেছি।”
তারপর কত বছর কেটে গেল। বাংলাদেশের বেশির ভাগ বন্ধুই এখন অবসর জীবনে। এই বছরের শুরুতে দেশে গেলাম—অনেকদিন পর। খবর পেয়ে স্কুল, কলেজ আর বুয়েটের বন্ধুরা ছুটে এলো। ক’টা গেট-টুগেদারও আয়োজন করলো।
বুয়েটের বন্ধুদের এমনই এক ডিনার জমে উঠেছে—ঠিক তখনই হাজির ড. আলী হায়দার মুন্নু—হাতে একটা প্যাকেট। ডিনার শেষে সবাইকে একত্র হতে বলল। তারপর প্যাকেট থেকে ধীরে ধীরে বের করল—একটি লাল চকচকে শার্ট।
সবাই তাকিয়ে—এ বয়সে মুন্নু কেন লাল শার্ট হাতে দাঁড়িয়ে? আর লায়নকে পাশে ডাকছে?
কৌতূহলী সবাইকে মুন্নু জানালো—চুয়াল্লিশ বছর আগে তাকে দেওয়া আমার লাল শার্টের গল্প। আমাকে জড়িয়ে ধরে শার্টটা হাতে দিয়ে বলল—
“যা, তোর লাল শার্ট ফিরিয়ে দিলাম।”
আমাদের চোখ ছলছল—বন্ধুরা করতালিতে ফেটে পড়ল—জীবনের এক বিশেষ মুহূর্ত সৃষ্টি হলো।
বন্ধুত্ব আর ভালবাসায় ভেজা এ দিনটি আমার জীবনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ভালো থাকিস বন্ধুরা।
Comments 0
No comments yet. Be the first to comment!
Sign in to leave a comment.