এক
১৯৮৯ সালের ১৭ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আগত নবীন ছাত্রদের সাথে শের এ বাংলা হলের প্রভোস্ট অফিসের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অসহায় লাগছিল । বাক্স পেটরা নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে বাসে করে মহাখালি নেমে রিক্সায় করে সরাসরি পলাশি শেরে বাংলা হলের প্রভোস্ট অফিস । কোন ধরনের ঝামেলা ছাড়া এইটুক পথ আসতে পারলেও ঘাবড়ে গেলাম সদ্য পরিচিত হওয়া অন্যান্য ছাত্রদের কথা শুনে। হলে সবার সিট নাও হতে পারে এই আশংকায় অনেকের কপালেই চিন্তার ভাজ। অপেক্ষারত ছাত্রদের মুখে মুখে একথা ছড়িয়ে পড়ে যে প্রভোস্ট স্যার যদি ঢাকায় থাকার আর কোন জায়গা আছে কিনা এই জাতীয় প্রশ্ন করেন, হলের সিট পাওয়ার জন্য অবশ্যই উত্তর হতে হবে না বোধক । প্রভোস্ট স্যার সত্যি সেদিন জানতে চেয়েছিলেন ঢাকায় থাকার মত আর কোন জায়গা ছিল কিনা । আগে থেকে শেখানো না বোধক উত্তর দেয়ার সময় অসহায় বোধ করেছিলাম, ওই বিশাল শহরে সত্যি সেদিন আমার থাকার আর কোন জায়গা ছিলনা । তবে ওই পর্যন্তই, এর পর শের এ বাংলা হল, বুয়েট, ঢাকা শহর আমার এমনই আপন হয়ে গেল যে নিজেকে আর কখনোই ওই শহরে আগন্তুক মনে হয়নি।

দুই
১৯৯১ সালের শেষ এপ্রিলের কোন এক বিকেলে শের এ বাংলা হলের ক্যান্টিনে এক বড় ভাইয়ের সাথে প্রলয়ঙ্করি সাইক্লোনে চট্টগ্রাম আর সংলগ্ন দ্বীপ সমূহ লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল । আমার আগ্রহ দেখে সেদিন সন্ধ্যায়ই সেই বড় ভাই আমাকে বুয়েট অডিটোরিয়ামের সম্ভবত দোতালার একটা কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে অবাক হই, আগে থেকে আসা ছাত্রদের ভিড়ে ওই কক্ষে প্রবেশের আর কোন অবস্থা না থাকলেও ঠেলে কোন ভাবে দুজন ভিতরে প্রবেশ করে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াই । মাঝখানে বসে থাকা একজন স্যারকে ঘিরে ছাত্রদের ভিড়। স্যার কথা বলছেন ভারী গলায় – দেশের এই বিপদের সময়ে বুয়েটের মেধাবী ছাত্রদের এগিয়ে আসা উচিৎ । স্যারের সাথে ডোনার অর্গানাইজেশনের ভাল যোগাযোগ আছে জানিয়ে বললেন এর মধ্যে ছাত্ররা যত ত্রান যোগার করতে পারবে সব একত্রিত করে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম রওয়ানা হবেন। যারা ভলান্টিয়ার হতে ইচ্ছুক, তারা যাতে টেবিলে রাখা খাতায় নিজেদের নাম আর ডিপার্টমেন্ট লিখে যায় । স্যারের কোথায় ভীষণ ভাবে অনুপ্রানিত হয়ে সেদিন নিজের নাম লিখে আসি ।
সম্ভবত সেই দিনটা ছিল সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন। আগামী সপ্তাহে ত্রানের জন্য চট্টগ্রাম যেতে হতে পারে এই ভেবে সাপ্তাহিক ছুটিতে ময়মন্সিং চলে যাই। চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা জানালে বাবা মা তেমন আপত্তি করেনি । ফেরার পথে মা আমাকে একহাজার টাকা তুলে দিলে আমি অবাক হই । আমি আমাদের পরিবারের সঙ্গতির কথা জানতাম, আমরা তখন চার ভাইবোন কলেজ আর বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ছি । মা বললেন – আমাদের নিয়ে ভাবিশ না বাবা, উরির চর আর চট্টগ্রামের যে ছবি পত্রিকায় দেখলাম, তাদের অনেক সাহায্য দরকার ।
পরের সপ্তাহে ক্লাস শুরু হওয়ার পর যাদের ত্রান নিয়ে যাওয়ার কথা তাদের মনে মনে খুজছি, তবে তেমন কোন তৎপরতা দেখতে পাচ্ছিলাম না । শেষ পর্যন্ত হলের সেই বড় ভাইয়ের কাছে গেলে জানতে পারি স্যার হঠাৎ ব্যাস্ত হয়ে পড়ায় তার পক্ষে আর এই ত্রান কাজ কোঅরডিনেট করা সম্ভব নয় । মন খারাপ হয়ে গেল ভীষণ রকম, তবে দমে যায়নি । বড় পরিসরে না হলেও আমরা ত্রান সংগ্রহের কাজ অব্যাহত রাখি । সেই ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোনে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হয় ।
তিন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর তাপসী রাবেয়া হলের সাথে শের এ বাংলা হল টিভি বিতর্কে হেরে গেল। আপাত সাদামাটা এই ব্যাপারটি আমার জন্য পীড়াদায়ক হয়ে দাড়ায়। কারন আমি ছিলাম শের এ বাংলা হল বিতর্ক দলের দ্বিতীয় বক্তা।
শুরতে হলের ছাত্র আর প্রভোস্ট অফিস এড়িয়ে চলতে থাকলাম। তারপরও কতটা এড়ানো যায়? হয়ত সকালে একা ক্যান্টিন এ নাস্তা করতে গেলাম, কোন বন্ধু পাশে এসে বসল - আরে মেয়েদের কাছে হেরে যাওয়া টা কোন ব্যাপার না? চিন্তা করিসনা । তারপর ক্যান্টিন বয়কে ডেকে -“এই স্যার কে দুইটা ডিম দিয়া নাস্তা দে, স্যার এর অনেক এনার্জি দরকার।“ এরকম আরও আনেক।
এরই মধ্যে বুয়েটে কোন এক কারনে সপ্তাহ দুয়েক এর ছুটি হল। আমি চলে গেলাম ময়মনসিংহে। একটু “তাপসী রাবেয়া” বিষয়ক আলচনার বাইরে যেতে পেরে বেশ স্বস্তি পেলাম। মময়মনসিংহের আরও কয়েক জন ছিল আমাদের ইয়ার এর এবং বুয়েট ছুটি হওয়ায় তারাও তখন ওখানেই। এই ছুটির সময় গুলো একসাথে বেশ ভালই কাটে। লম্বা সময় ধরে ভ্রহ্মপুত্র নদীর ধারে আড্ডা মারা, হলে সিনেমা দেখা ইত্যাদি ইত্যাদি। এরই মধ্যে বিতর্ক বিষয়ক আলচনা প্রায় বিসৃত।

এক বিকেলে বুয়েট এর বন্ধু কে নিয়ে অন্য আরেক বন্ধুর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। যার বাসায় গেলাম, তার প্রতি একটু ঈর্ষা আমাদের ছিলই। একটু খুলেই বলি। তার মানুষের (বিশেষ করে মেয়েদের) সাথে বন্ধুত্ব করার ক্ষমতা ছিল আসাধারন। আমাদের দেখেই সে বলল, - দোস্ত, তোরা একটু বস। টেলিফোন এ একটু ব্যস্ত আছি। এই আসছি।
আমরা বসার ঘরে সোফায় আরাম করে বসলাম, সামনে টিভি চলছে। তখনও সব বাসায় ডিশ আসেনি। বিটিভিই ভরসা। অবাক হলাম অনুষ্ঠান ঘোষণা শুনে – বিতর্ক, শের এ বাংলা হল, বুয়েট এবং তাপসী রাবেয়া হল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এরই মধ্যে আমাদের জন্য চা এল। তৃতীয় বন্ধু মাঝে মাঝে ঢুঁ মেরে দেখে যাচ্ছে। আমরা বাকি দুই বন্ধু টিভিতে অনুষ্ঠান দেখছি। প্রথমে ওদের একজন, আমাদের একজন হয়ে গেল। তারপর ওদের দ্বিতীয় বক্তার পালাও শেষ হল। এবার আমার পালা। আমরা শুনছি আর ক্রমেই অবাক হচ্ছি যে আমরা কেন এই দলের কাছে হেরে গেলাম। পাশে বসা বন্ধুকে প্রায় বুঝাতে সক্ষম হলাম যে আমরা ছেলে বলেই বিচারকদের পক্ষপাত মূলক আচরন।
এরই মধ্যে তৃতীয় বন্ধু এসে হাজির। সে হাসছে। তার হাসি যেন আর কোন ভাবেই শেষ হয়না। আমরা বাকি দুই জন বেশ বিরক্ত। তখন আমার বক্তব্যের শেষ আংশ হচ্ছে। বেশ ভালইত বলেছিলাম, এতে হাসির কি হল। তৃতীয় বন্ধু হাসি থামিয়ে বলা শুরু করলঃ সে এতক্ষন কথা বলছিল তার এক মেয়ে বন্ধুর সাথে। অন্য পাশে তার মেয়ে বন্ধুও টিভির কাছেই। কথা প্রসঙ্গে সে মেয়ের কাছ থেকে জানতে চায় যে সে বিতর্ক পছন্দ করে কি না। মেয়েটি আসলে বিতর্ক জাতীয় অনুষ্ঠান পছন্দ করেনা, কিন্তু টিভিতে হতে থাকলে কি আর করা। এর মধ্যে মেয়ে বন্ধু জানাল যে সেও ওই বিতর্ক অনুষ্ঠান দেখছে। তবে সে আজকের বিতর্ক দেখে বেশ হতাশ। কারন আজকের অনুষ্ঠান এর ছেলে গুলো দেখতে মোটেও আকর্ষণীয় না। যেই আমার পালা শুরু হল তখন আমার বন্ধু জিজ্ঞসা করে, যে এখন বলছে - এই ছেলেটা দেখতে কেমন? সাথে সাথে মেয়েটা বলে ওঠল – জঘন্য জঘন্য, জঘন্য.........।। হাসতে হাসতে সেই বন্ধু সোফার উপর গড়িয়ে পরে ।
চার
বুয়েটের কথা ভাবতে গেলে নিজেকে এই ভেবে ভাগ্যবান মনে করি যে অসম্ভব সব মেধাবী ছাত্রদের সাথে আমার পড়াশুনা করার সুযোগ হয়েছিল । আমার খুব কাছের এক বন্ধু সেই প্রথম থেকেই ভাল রেসাল্ট করে আসছিল । ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সেমিস্টারের পর ওই বন্ধু সহ আমাদের একটা গ্রুপ ছিল যারা একমাত্র পড়াশুনা করা ছাড়া দিনরাত আর সব কিছুই করে বেড়াতাম । একসাথে রাত জেগে কার্ড খেলা, সুযোগ হলে ক্লাস ফাঁকি দেয়া, এক টিকিটে দুই ছবি দেখা, আরও কত কি । ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনালের পরে দেখলাম আমি কোন রকমে পাশ, আমাদের দলের আরেক বন্ধু দুই সাবজেক্টে রেফারড, আর আমাদের সেই বন্ধুর অবস্থান ক্লাসে সেরাদের মধ্যে । আমাদের সেই বন্ধুর কথা ভাবতে গেলে এখনো অবাক হই, এত ফাঁকিবাজি করে প্রতিটি পরীক্ষায় ভাল রেসাল্ট করত কিভাবে?
পাঁচ
বিকেলে টিএসসি তে যেতাম প্রায়ই। আর্কিটেক্ট বিল্ডিং এর পাশে বুয়েট থেকে বের হওয়ার যে গেট টা ছিল, আমাদের সময়ে সে গেট স্থায়ী ভাবে বন্ধ করে দেয়া হয় । তাই আমরা টিএসসি যেতাম পলাশী থেকে এস এম হল, উদয়ন স্কুল, শামিম শিকদার এর ভাস্কর্য , শামসুন্নাহার হল অতিক্রম করে । টিএসসি তে যেতে যেতে একসময়য় ভিড়ে যাই নাটকের দলের সাথে । টিএসসি তে গেলে বুয়েটের অনেকের সাথেই দেখা হয়ে যেত । তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বান্ধবীদের সাথে লম্বা আড্ডা চলত টিএসসি চায়ের দোকান গুলোতে। বন্ধুদের কারো সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে আজও সেই দিনগুলোর কথা ভেবে স্মৃতিতে ডুবে যাই।
Comments 0
No comments yet. Be the first to comment!
Sign in to leave a comment.