গদ্য / Prose
Booklet View
প্যাশনের অগ্নিশিখা

প্যাশনের অগ্নিশিখা

Cricket

লেখক / Writer
Ajoy Majumder
November 19, 2025
351
0
তুই জানিস না। না, আমি জানি, বরং তুই জানিস না। রুমের বাইরে বেশ একটা শোরগোল। এক জন বলছে এ বছর লারা বেশী রান করেছে আর অন্য জন বলছে না, টেন্ডুলকার বেশী রান করেছে। দুজনের বাক-বিতন্ডা দেখে আরো কয়েকজন উৎসুক ছাত্র করিডোরে জড়ো হলো। আমি বলছি বুয়েটের আহসানউল্লা হলের উত্তর ব্লকের নীচ তলার কথা। দু’ বন্ধুর কেউই পরাজয় মানতে নারাজ। এরই মধ্যে একজন বলে উঠলো – আরে তোমরা ঝগড়া থামাও। চলো আমাদের সামনের রুমেই আছে ক্রিকেটের জ্যান্ত রেকর্ড বুক। হ্যাঁ, ঐ সামনের রুমে থাকে অঙ্কুর, যার কাছে ক্রিকেট খেলার পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা জীবনের একটা অপরিহার্য অঙ্গ। তো সবাই মেলে গেল অঙ্কুরের রুমে। সানি আর বিক্রম, দু’জনেই তাদের নিজস্ব statement জানাল। বেশ টানটান উত্তেজনা। অঙ্কুর একবার সানির মুখের দিকে তাকালো এবং তারপর বিক্রমের মুখের দিকে তাকালো। তারপর কে ঘোষনা করল – তোমরা দু’জনেই সঠিক। এ বছর লারা টেস্ট ক্রিকেটে বেশী রান করেছে তবে ওয়ানডে ম্যাচে টেন্ডুলকার সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী। আর সে হিসাবে সানি ও বিক্রম দু’জনেই সঠিক।
এরপর শুরু হলো খুবই আপ্রত্যাশিত আধ্যায়। অঙ্কুর তার আলমারী থেকে অনেক গুলো খাতা বের করল আর একে একে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের স্কোর কার্ড দেখাতে লাগলো। এগুলো দেখে সানি আর বিক্রম দু’ বন্ধুর মোটামুটি ভিমরী খাওয়ার অবস্থা। বিক্রম জিজ্ঞাসা করল – অঙ্কুর, তুমি বুয়েটে পড়ে কিভাবে এত সময় পাও এইসব রেকর্ড লেখা আর প্রতিটি ম্যাচের স্কোরকার্ড? তুমি পড়াশোনা কর কখন? সানির চোখেও একই প্রশ্ন। ওদের আবস্থা দেখে অঙ্কুর কিছু বলার আগেই তার সিনিয়র রুমমেট সুরেশ, যে কিনা ওদের ডেকে এনেছিল অংকুরের কাছে, বলে উঠলো- একে বলে “Feed Your Passion”. অঙ্কুর যেটা ভালবাসে তার জন্য সময় সে বের করে নেয়। সেই ৯০ দশকের শুরুর দিকে ক্রিকেট ম্যাচের পূর্ণ স্কোর কার্ড সংগ্রহ করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। আহসানউল্লা হলের কমনরুমে যেসব খবরের কাগজ রাখা হতো সেগুলোতে বেশীর ভাগ সময়েই শুধু সংক্ষিপ্ত স্কোর থাকতো। অঙ্কুর বিভিন্ন হলের কমন রুমে ঘুরে ঘুরে কাগজে টুকে আনত আর তারপরে নিজের রুমে এসে তার ক্রিকেটের খাতায় লিখে রাখতো। এভেবেই সে বুয়েট জীবনের পুরোটা সময় তার ভাললাগার বিষয়ে কোন কার্পন্য রাখেনি। যাইহোক- সানি, বিক্রম এবং আরো কয়েকজন যারা এসেছিল প্রসন্ন মনে ফিরে গেল আর বলে গেল – অঙ্কুর, আমরা সব সময় তোমার কাছেই ফিরে আসবো যখনি ক্রিকেট সংক্রান্ত কিছু জানতে ইচ্ছে হবে। আশা করি তুমি আমাদের হতাশ করবে না। অংকুরও বলল – অবশ্যই, আমি যতটুকু জানি বা জানতে পারি সেটা অন্যদের সাথে শেয়ার করতে আমি সর্বদাই তৈরী।
রুমের বাইরে গিয়ে সানি বলে উঠলো- অঙ্কুর একটা পাগল। কেউ এত সময় এভাবে নষ্ট করে? বিক্রম সাথে সাথেই কিছু বলল না। দলের আন্যরা সবাই একটু দূরে সরে গেলে বিক্রম বলল সানিকে , “কি জানি অঙ্কুর পাগল কিনা, তবে সে প্রচণ্ড Passionate. হয়তো এটাই ওর জীবনের বিশেষত্ব, আর এই passion-ই হয়তো ওকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।
তো কে এই অঙ্কুর? কি তার জীবনের ইতিহাস? আর বুয়েট থেকে বের হয়ে এত বছর পর সে কিইবা করছে? এখনো কি ক্রিকেট নিয়ে সেই ছাত্র জীবনের মতই পাগল? “Feed Your Passion” তাকে জীবন পরিক্রমায় কোথায় নিয়ে গেল?
অঙ্কুরের জন্ম এবং বেড়ে উঠা সবই বাংলাদেশের একটি গ্রামে। একেবারে অজ পাড়াগাঁ নয় তবে খুব একটা ভালোও নয়। তার প্রাইমারী স্কুল, হাই স্কুল এবাং কলেজ শিক্ষা সবই ঐ গ্রাম থেকেই। ছোটবেলায় পড়াশোনাতে তেমন আহআমরি ভাল কিছুও করেনি। সাধারণত প্রথম তিন থেকে দশের মধ্যে থাকতো। তার বাবা ছিলেন এলাকার খুবই নাম করা শিক্ষক। তার বড় দাদাও পড়াশোনাতে বেশ ভাল ছিল এবং সেও বুয়েট থেকেই পাশ করেছে। অঙ্কুরের ক্রিকেটের সাথে প্রথম পরিচয় সে যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। আর একেবারে শুরু থেকেই ক্রিকেট হয়ে থাকল তার ধ্যান জ্ঞান। তবে সে যতই উপরের ক্লাসে উঠতে থাকলো তার পড়াশোনার রেজাল্টও ততই ভালো হতে থাকল। এইস, এস, সি পরীক্ষায় সে বেশ ভালই করে এবং মেধা তালিকায় স্থান পায়। তারপর জীবনের গতিতে চলতে চলতে কয়েক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্ত্তি পরীক্ষা দিয়ে তার সব গুলোতেই চান্স পেয়ে প্রথমে মেডিক্যাল কলেজে শুরু করে শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বুয়েটে ভর্ত্তি হলো তারই বড় দাদার পথ বেছে নিয়ে। বুয়েটে অঙ্কুর কখনোই খুব একটা ভাল রেজাল্ট করেনি এবং পুরোটা সময়ই প্রথম ২৫% থেকে ৩০% এর মধ্যে থাকতো। সে টিউশনি করে নিজের থাকে, খাওয়া ও লেখাপড়ার খরচ নিজেই চালাতো। এরই মধ্যে টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখা আর আন্তর্জাতিক ম্যাচের স্কোর কার্ড সংগ্রহ করা ছিল তার প্রধান নেশা। অঙ্কুরের অনেক গুলো খাতা ছিল এইসব লেখার জন্য। যার কিছু কিছু ৩০ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও তার কাছে এখনো আছে।
জীবনের পরিক্রমায় বহু বসন্ত পার হয়ে জীবনের হাফ সেঞ্চুরী পার করে এখন অঙ্কুর ক্যানাডাতে বসবাস করছে। তার সিনিয়র রুমমেট সুরেশ- যে কিনা তাকে খুবই স্নেহ করতো আর বলেছিল “Feed Your Passion”, সেও ক্যানাডাতে থাকে। অঙ্কুর এখন খুব বেশী ক্রিকেট খেলা দেখে না আর এখনকার দিনে স্কোর কার্ড লেখার একেবারেই কোন প্রয়োজন নেই। ESPNCRICINFO তে ক্রিকেট সংক্রান্ত সবই পাওয়া যায়। তাহলে কি অঙ্কুরের কি আর কোন প্যাসন নেই? না, ঠিক তা নয়, ক্রিকেট নেই তবে অন্য কোথাও তার প্যাসন কাজ করছে।
কিছু দিন আগে অঙ্কুরের সাথে আমার খুব গভীর আলচনা হয়েছিল। তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম – অঙ্কুর, তুমি যদি তোমার জীবনে পিছন ফিরে চাও এবং সুযোগ পাও তুমি কি কোন কিছু আলাদা ভাবে করতে চাইবে? অঙ্কুর বলল, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় motto হচ্ছে- Feed Your Passion. আমি সারা জীবন সেটাই করে এসেছি। যখন যেটা ভাল লেগেছে তার প্রতি ১১০% দিয়েছি। আমার জীবনে কোন Regret নেই। হয়তো পড়াশোনাতে আমি ১০০% দেই নাই তবে তার জন্য আমার কোন দুঃখ নেই। বিশববিদ্যালয় থেকে আমার যেটা জানার ছিল সেটা আমি জেনেছি। আর জীবনে শিক্ষার কোন শেষ নেই। এখনো প্রতিদিনই কিছু না কিছু শিখছি। আমার কখনোই মনে হয়নি আমার রেজাল্ট আর একটু ভাল হলে আমার জীবনে তেমন কোন তারতম্য আসত। বরং যা পেয়েছি তাতেই আমি মহা খুশী। জীবনের বাকী দিন গুলোও যেন আমি কোন না কোন ব্যাপারে Passionate থাকি যেটা প্রতিটি দিন এবং ক্ষণ সুখময় ও তাৎপর্যময় করে রাখবে। এই Passion ই আমার প্রধান চালিকা শক্তি।
পাঠকগণ- এই হলো আমাদের বুয়েটের তারুণ্যের পাগল অঙ্কুর। “Feed Your Passion” তাকে নিরাশ করেনি।


Comments 0

No comments yet. Be the first to comment!

📢 Proudly Supported By

Advertisement

Advertisement