ছোট গল্প / Short Story
Booklet View
রবীন্দ্রনাথের ’বসন্ত’ গীতিনাট্য

রবীন্দ্রনাথের ’বসন্ত’ গীতিনাট্য

Literature

লেখক / Writer
Bhajan Sarkar
November 29, 2025
245
0
রাজা মন্ত্রীসভা থেকে পালিয়ে এসেছেন কবির কাছে।  কবি বলছেন, রাজা মাঝে-মাঝে সরে দাঁড়ালে প্রজারা রাজত্ব করবার অবকাশ পায়। রাজকোষ শূন্য। কবি বলেন, রাজার অর্থ যখন শূন্যে এসে ঠেকে প্রজা তখন নিজের অর্থ খুঁজে বের করে, তাতেই তার রক্ষা। তবুও রাজা শান্ত হতে পারেন না। প্রজাদের দুর্ভিক্ষের কথার চেয়ে রাজা নিজেকে রক্ষার কথা ভেবেই বেশী চিন্তিত। কবি রাজাকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমাদের সাথে ঋতুরাজ বসন্ত আছেন; উনি ক্ষুধার কথা সুধা দিয়ে ভোলান। রবীন্দ্রনাথের ‘ বসন্ত’ গীতিনাট্যের এটাই মূলকথা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, রাজা যখন প্রজাদের রোষানল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চান, তখন এমন ব্যবস্থা করেন যা’তে “ ক্ষুধার কথা সুধা দিয়ে “ ভুলিয়ে রাখতে পারেন। কবি রাজাকে বসন্ত উৎসব আয়োজনের কথা বলেন।
আসলে রবীন্দ্রনাথ ১০০ বছরেরও অধিক সময় আগে যা বলেছিলেন সেটির প্রাসংগিকতা সব সময়। অনাদিকাল থেকেই শাসক  “ক্ষুধার কথা সুধা দিয়ে” ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে আসছেন। সে ‘ সুধা’ কখনও ধর্ম, কখনও বা যুদ্ধবিবাদ। তাই তো শাসকেরা নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে জনগনকে ধর্মের আফিমে ডুবিয়ে রাখেন। দেশে সুশাসন নেই, নাগরিকের  মৌলিক অধিকার নেই, জনগনের প্রাত্যহিক জীবনে শান্তি নেই, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস; অথচ সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে মসজিদ করছেন, রাম মন্দির বানাচ্ছেন, ধর্মের জোয়ারে মানুষকে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। এগুলো রবীন্দ্রনাথের  ‘বসন্ত’ নাটকের  ওই “ ক্ষুধার কথা সুধা দিয়ে ভোলানো” ছাড়া অন্য কিছু নয়। যে সব শাসক আর একটু অগ্রসর, যাদের জনগন ধর্মের আফিমে  আর ডুবে না, তাঁদের কৌশল আবার ভিন্ন; তাঁরা বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে রাখে, কিছু অনুগত মিডিয়া তৈরী করে ভয়ঙ্কর সংবাদ নিরলস প্রচার করে, মানুষের দৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে দেয়। এই যে রাশিয়া-ইউক্রেন কিংবা ইসরাইল-গাজা যুদ্ধ এগুলোও কিছু দেশের তথাকথিত গনতান্ত্রিক শাসকের “ ক্ষুধার কথা সুধা দিয়ে ভোলানো” ছাড়া অন্য কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ সব সময় আশার কথা শোনান। তাই ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যেও আশার কথা, যদিও বর্তমানের শাসকেরা রবীন্দ্রনাথের কথা শুনবেন এমন বোকা তাঁরা নন। তবুও রবীন্দ্রনাথের আশার বাণীটুকু বলি। বসন্ত উৎসবে সবাই মাতোয়ারা। রাজা চাইছেন মানুষ দুর্ভিক্ষের কথা ভুলে ঋতুরাজ বসন্তের উৎসবে মোহিত হয়ে থাকুক। কবি বলেন, এবার ঋতুরাজ বসন্তের যাবার সময় হয়েছে। রাজা আবার শঙ্কিত। কবি  বলেন, যথার্থ পূর্ণ হয়ে উঠলে রিক্ত হওয়ার খেলায় ভয় থাকে না। অন্যদিকে রাজা দেখছেন, আভিজাত্য ভুলে রাজপরিষদ বসন্ত উৎসবে মাতোয়ারা। কবি বলছেন, আজ ধরণীতে অগৌরবের উৎসব। রাজা ভাবছেন, রাজগৌরব কি বিলীন হতে চলেছে? কবি বলেন, রাজগৌরব, সেও আজ টিকলো  না। তাই তো ঋতুরাজ আজ রাজবেশ খসিয়ে দিয়ে বৈরাগী হয়ে বেরিয়ে চলেছেন। আমাদের একালের রাজাদের রাজবেশ খসাবেন সে সাধ্যি কার? রাজা যাবে, রাজা আসবে কিন্তু চরিত্র বদলাবে কি? নতুন রাজা এসে প্রজাদের দুর্ভিক্ষ ভোলাতে ধর্ম কিংবা যুদ্ধ  নিয়ে খেলতেই থাকবে। পুনশ্চঃ রবীন্দ্রনাথ "বসন্ত" গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন কাজী  নজরুলকে । এ প্রসংগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর   তাঁর স্নেহধন্য সাহিত্যিক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে বলেছিলেন,
"জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি। সেখানা নিজের হাতে তাকে দিতে পারলে আমি খুশি হতাম, কিন্তু আমি যখন নিজে গিয়ে দিয়ে আসতে পারছি না, ভেবে দেখলাম, তোমার হাত দিয়ে পাঠানোই সবচেয়ে ভালো, আমার হয়েই তুমি বইখানা ওকে দিও।” এ নিয়ে আরও কিছু তথ্য পবিত্র বাবু বলেছেন, “নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গ পত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।...নজরুলের কাব্যে অসির ঝনঝনানি আছে। আমি যদি তরুণ হতাম তা হলে আমার কলমেও ওই একই ঝংকার বাজতো।” অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যের ’বসন্ত’ প্রকৃতির ঋতুরাজ বসন্ত। এ বসন্ত বন্দনার অনুসংগের সাথে  কাজী নজরুল নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন দেশাত্মবোধক দ্যোতনায়।


Comments 0

No comments yet. Be the first to comment!

📢 Proudly Supported By

Advertisement

Advertisement