চোখে ঘুম আর ক্লান্তি নিয়ে অঞ্জন ল্যাপটপটা বন্ধ করে । পর্দার নীল এখনো চোখে লেগে আছে, দৃষ্টির সীমা পেরিয়ে যেন মাথার একেবারে পেছনে চলে গেছে কম্পিউটার কোডের আলো । শাওয়ারে গরম জলে দাঁড়িয়ে সে চোখ ঘষে , মুখে লাগায় ক্লিনজার, শরীরে মেখে নেয় অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল সাবান।
শাওয়ার থেকে বেরিয়ে প্রায় নগ্ন শরীরে বিছানায় গলিয়ে দেয় নিজেকে —যেন একটা নিরাপদ গুহায় । বাইরে তখনও বিশ্রী সামারের রাত, তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রিরও উপরে ,টরন্টোর আকাশে বইছে লু হাওয়া । অঞ্জন ঘুমোবার সময় মুঠোফোনের অ্যাপ দিয়ে থার্মোস্টেটে তাপমাত্রা নামিয়ে আনে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে , আলিঙ্গন করে পাশে থাকা বালিশ। কমফোর্টার তাকে উষ্ণতা দিয়ে রাখে ।একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসবার অপেক্ষায় থাকে অঞ্জন —তার প্রিয় পডকাস্ট । অঞ্জন জানে, এই কণ্ঠই কোড, ক্লান্তি আর নিঃসঙ্গতা মুছে দিয়ে তাকে নিয়ে যাবে এক অন্য আরামের রাজ্যে । অঞ্জন কানে ইয়ারবাড গুঁজে নেয় আর আলতো বোলে নিজেই নিজের পা ঘষতে থাকে । তারপর টোকা দেয় সেই চেনা ছবিটার ওপর—কালো চুল, বাঁকা নাক, যেন পাশের বাড়ির মেয়েটি । 'আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ ' পিয়ানোয় পডকাস্টের সূচনাসংগীত বাজতে শুরু করে ।
“হ্যালো এভরিওয়ান, আমি বেলা বোস , আর আপনি শুনছেন 'চলুন কথা বলি ' । এই অভিজ্ঞতা আমার, একই অভিজ্ঞতা আপনার ও , আর স্পয়লার অ্যালার্ট: জীবনে পুরো সুস্থ থেকে পার পাওয়ার উপায় নেই—সবাই আমরা কমবেশি এলোমেলো। তবে অন্তত আমরা সবাই একসঙ্গেই এলোমেলো, তাই না?”
বেলার কণ্ঠ—গভীর আর ধোঁয়াশাছন্ন —অঞ্জনের মধ্যে সরাসরি ঢুকে পড়ে , ঠিক যেন বেলা তারই একটি অংশ। অঞ্জনের জড়তা উধাও হয়ে যায় । সে ভালোবাসে বেলার কণ্ঠ , পুরে নেয় একেবারে নিজের ভেতর —এই কণ্ঠ তার নিজের চিন্তাগুলোকে স্তব্ধ করে দেয়।

অঞ্জন চোখের ওপর মাস্কটা ঠিক করে নেয় । প্রথম ফোনটি করে এক তরুণী। সে বলে , ছেলেবন্ধু যখন তার ঠোঁটে চুমু দিতে মুখ বাড়িয়ে দেয় , তার ভালো লাগে না—কারণ সে ঠিক একইভাবে পরিবারের এক বন্ধুর দ্বারা নিগৃহীত হয়। সেই স্পর্শ তাকে নিরুপায় ও বিষন্ন করে তোলে। "কিন্তু আমার তো মনে হয়… এটা সম্পর্কের খুব সাধারণ একটা ব্যাপার । আমি কি পারি আমার ছেলেবন্ধুকে বলতে যে এটা না করতে? তাই বেশিরভাগ সময় আমি চুপ করে থাকি," মেয়েটির কণ্ঠ যেন কোনো বদ্ধ ঘরে আটকে পড়া —কাঁপা কণ্ঠে ভয় লুকোতে পারে না ।
অঞ্জন বুঝতে চেষ্টা করে, বেলা কী বলবে। অঞ্জন ভাবে , বেলা হয়তো বলবে, মেনে নাও, মানিয়ে নাও , হাজার হলেও তোমার প্রেমিক পুরুষ। কিন্তু বেলা তা বলে না। অঞ্জন কল্পনা করছে বেলার ঠোঁট, লাল লিপস্টিকে রাঙানো , মাইক্রোফোনের কাছে এগোনো । বেলার কন্ঠ ভেসে আসে ইথারে - "তোমার সাথে যা ঘটেছে , তা সত্যিই ভয়ঙ্কর। আমি শুনে খুবই দুঃখিত। এখন তুমি আর ছোট্টটি নও , যা তুমি চাও না , তা করতে তুমি বাধ্য নও। যদি সে সত্যিই তোমাকে ভালোবাসে , তাহলে সে তোমার মর্যাদার সীমা কখনো অতিক্রম করবে না। আর যদি সে সেটা করে, তাহলে তুমি জানবে—ওকে ছেড়ে দেওয়ার সময় হয়েছে। নিজেকে পুরোপুরি অন্য কারো সামনে মেলে ধরা, আর বিশ্বাস করা যে, সে তোমাকে ঠিক সেইভাবেই গ্রহণ করবে—এটাই আসল ব্যাপার , আসল সাহস। আর যতোবার তুমি এটা চর্চা করো, ততোবার তুমি একটুখানি করে আরও পূর্ণ, আরও সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠো। এখনই সময়, তোমার এলোমেলো জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলবার । কারণ যদি তুমি এটা না করো, তাহলে তোমার আর তার মধ্যে, বা ভবিষ্যতে যাকেই তুমি ভালোবেসে গ্রহণ করো , তার সাথে সবসময় একটা অদৃশ্য দেয়াল থেকে যাবে। তুমি কি চাও সারাজীবন এমন ছেলেদের সঙ্গে কাটাতে, যারা এমন কিছু করবে যা তোমাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে ফেলে?" বেলা একনাগাড়ে বলে যায়।
এবার ইথারে বেজে উঠে , 'আজি হৃদয় আমার যায় যায় যায় যে ভেসে ' । অঞ্জন আস্তে আস্তে তন্দ্রায় ভেসে যেতে থাকে । বেলা যে সান্ত্বনা ওই তরুণীকে দেয় , সেটাই যেন এখন অঞ্জনের পুরো শরীর, মনকে জড়িয়ে রাখে ।
***
ট্রাফিক জ্যামে পড়ে অঞ্জন , ব্রেক চেপে একটু একটু করে এগোয় । সকাল নয়টার সূর্য ততক্ষনে আকাশকে তাতিয়ে দিয়েছে —বড়ো বেপরোয়া সাদা এই সূর্য , চল্লিশ ডিগ্রী সেলসিয়াসে শরীর পোড়ানো গরম — উইন্ডশিল্ডগুলো যেন ঝলসানো আয়না । এসির ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগলেও, ত্বকে যেন আগুনের ছোঁয়া। গাড়ির সানভাইজারটা নামিয়ে নেয় অঞ্জন , তবু খুব একটা রেহাই মেলে না ।
স্পটিফাইয়ে বেলার গতকালের পডকাস্টের দ্বিতীয় এপিসোডটা চালু করে অঞ্জন —ভলিউম বাড়িয়ে দেয় , বেলার মদির করা কণ্ঠ গাড়ির ছোট্ট কেবিনে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে । অঞ্জনের এই নিয়মিত অভ্যেস বেলার পডকাস্ট শোনা - কখনো অফিস যাওয়ার পথে, কখনো বাসায় ডিশ ওয়াশারে থালা বাসন মেজে ঢোকাবার সময় , বা বেশিরভাগ সময় ঘুমের ঠিক আগে, যদি না সেদিনের ক্লান্তি তাকে আগেই ঘুমের অতলে টেনে নিয়ে যায় ।
***
দু’বছর আগেও, অঞ্জন ছিল বেকার—ঘর থেকে বেরোতে পারত না, দিনে এক বেলাই যা খাবার জুটত। কিন্তু বেলার পডকাস্ট ছিল ফ্রি । আর বেলার দু ঘণ্টার দুষ্টু-মিষ্টি কথাই ছিল দিনের একমাত্র সময়, যখন নিজেকে আর একা এবং অসহায় মনে হতো না।
বেলার পরামর্শ কখনও মেকি আবেগের নয় , যেমনটা থেরাপিস্টরা করে। বেলা ছিল আলাদা—থেরাপিস্টের চেয়েও ভালো। “শোন , আমি জানি বলাটা সহজ , করাটা কঠিন, কিন্তু একবার তোমার পাড়ার চারপাশটা ঘুরে এসো,” গতবছর এক শ্রোতাকে বলেছিলেন বেলা , আর অঞ্জনের মনে হয়েছিল — বেলা যেন ওকেই বলেছে । “পাড়ার গ্রোসারি দোকানের সেই তরুণী ক্যাশিয়ার , যার গলার নিচে আছে ছোট্ট একটি তিল , গিয়ে ওর সঙ্গে একটু কথা বলো। একটা চুয়িং গাম নিয়ে এসো বা একটা গোল্ডফিশ । নিজের গন্ডির বাইরে অন্য কারও সাথে একটু আলাপ পরিচয় করো ” তার কথাগুলো মিশে গিয়েছিলো ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে চলা যন্ত্র সংগীতে - অঞ্জনের প্রিয় সেই 'জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজো আমি '। সেই মুহূর্তে, জীবনটা যেন একটু হলেও সচল মনে হয়েছিল ।বেলার কারণে অঞ্জন সাহস করে অষুধ খাওয়া শুরু করেছিল । সেটাই তাকে একটু একটু করে সাহস জুগিয়েছিল —একটা লোনের জন্য আবেদন করতে, একটা কন্টেন্ট লেখার বুটক্যাম্পে ভর্তি হতে।

আর এখন? সে ডাউনটাউন টরন্টোয় একটা স্টার্টআপ অফিসে কাজ করছে , ভালো চাকরি।
এই মুহূর্তে, অঞ্জন চুমুক দিচ্ছে তার প্রিয় পডকাস্টের ট্রাভেল মগ থেকে। মগের গায়ে লেখা - চলুন কথা বলি আর সেই সাথে বেলার একটা ক্লোজ শট ছবি । একটা সময় ছিল, যখন অঞ্জন ভাবত কিছুই বদলাবে না। আর এখন, তার চারপাশটা বদলে গেছে বেলার কণ্ঠ শুনে ।
অঞ্জন তার গাড়ি পার্ক করে সৃজনীর পার্কিং লটে—একটা স্টার্টআপ যারা বিগ ডেটা সংগ্রহ করে আর সেগুলো মার্কেটিং স্টার্টআপদের কাছে বিক্রি করে। সে উপেক্ষা করে অফিসের সুন্দরী রিসেপশনিস্ট মহুয়াকে, যেমনভাবে মহুয়া ও ওকে সবসময় উপেক্ষা করে।
অঞ্জন তাকে কয়েকবার ডেটে যেতে বলেছিল, কিন্তু মহুয়া প্রত্যেকবার ভদ্রভাবে হেসে না বলেছিল। তাই সে ভাবলো — মহুয়াকে একটু ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করি, ও কী ভালোবাসে, কী করে, এসব…। সে জানত মহুয়া আঁকতে পছন্দ করে, তাই কোম্পানির নিজস্ব চ্যাট সিস্টেমে জিজ্ঞেস করেছিল—"তুমি কী আঁকতে ভালোবাসো?"
এক ঘণ্টা পর মহুয়া উত্তর দিল, যদিও সেদিন ফ্রন্ট ডেস্কে তেমন কাজ ছিল না—"এই-সেই।"
অঞ্জন বলল, “তুমি কিছু দেখাতে পারো তোমার আঁকা?”
"না," বলল মহুয়া ।
“আরে, দেখাও না,” অঞ্জন আবারো বলল। বেলার বাণী মনে পড়ে —ভালো জিনিস সহজে পাওয়া যায় না।
মহুয়া বলল, “যদি কখনও আমার আর্ট শো হয়, তোমায় জানাবো।”
“আরে, বাজি ধরে বলতে পারি দারুণ আঁকো,” অঞ্জন আরেকবার চেষ্টার ভঙ্গিতে বলল।
মহুয়া লিখল, “হ্যাঁ, ভালোই আঁকি, কিন্তু শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে না, ঠিক আছে?”
অঞ্জনের ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠলো । রাগে ওর আঙুল ছুটে গেলো কী-বোর্ডে, লিখে ফেললো , "যে-ই তোমার সঙ্গে প্রেম করবে, তার জন্য সত্যিই খারাপ লাগছে আমার"।
***
অফিসের কিচেনে অঞ্জন তার ট্রাভেল মগে কফি ঢালে , এক মুঠো কাজু বাদাম নিয়ে নিজের ডেস্কে ফিরে আসে । দু’পাশে বসা সহকর্মী দুজনকে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যালো জানায় , তারপর আবার হেডফোন কান দুটোয় গুঁজে দেয় ।
আজ বেলা নতুন একটা স্পটিফাই প্লেলিস্ট শেয়ার করেছে—বেস্ট অফ রবীন্দ্র সংগীত । হেডফোন পরতেই বাইরের গোলমাল মুছে যায় , আর অঞ্জনের কানে ঢোকে বেলার শান্ত স্বর।
“হাই , বেলা এখানে। ব্যাকগ্রাউন্ডে সুর বেজে উঠে 'তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে' । "এই গানের কয়েকটা লাইন আমাকে পুরো জুড়িয়ে দেয়, আশা করি তোমারও মন শান্ত হয়ে যাবে । একটু সময় নাও আর তোমার টেনশনকে বলে দাও—ছোট একটা ব্রিজ থেকে ঝুপ করে একটা লাফ দিতে ।”
কথার ফাঁকে ফাঁকে বাজতে থাকে জয়িতা , শ্রীকান্ত , ইমন —এদের সুরে অঞ্জনের চোয়াল ধীরে ধীরে আলগা হতে থাকে , শরীরটা ও যেন একটু হালকা মনে হয় । এটাই বেলার মধ্যে অঞ্জনের সবচেয়ে প্রিয় দিক—একেবারেই ন্যাচারাল , খোলামেলা আলাপ । বেলা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সরাসরি কথা বলে । অঞ্জনের জীবনে মেয়েদের সবসময় একটু ভয়ই লাগত, কিন্তু যখন বেলা নিজের উদ্বেগের কথা, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের গল্প, কিংবা টিনেজ বয়সে তার আত্মহত্যার চেষ্টার কথা বলে —অঞ্জন অনুভব করে , যেন সে ওর খুব কাছের কেউ।
অবাকই লাগে —এই মেয়েটিকে সে কখনো দেখেনি, কিন্তু তবুও এই স্মার্ট, কিউট, রাবীন্দ্রিক মেয়েটার সঙ্গে তার হৃদয়ের একটা বাঁধন তৈরি হয়ে গেছে ।
***
আসলে পুরো ঠিক বলা হলো না , বেলার সাথে আগেও একবার দেখা হয়েছিল, অল্প সময়ের জন্য। 'আমার বেলা যে যায়' এর সুরে মাথা দোলাতে দোলাতে কোড লিখবার সময় অঞ্জন চেষ্টা করছিলো স্মৃতিটা মাথা থেকে সরিয়ে রাখতে, কিন্তু সেটা কেমন করে যেন মগজ থেকে সরে না । সেটা ছিল গত বছর, অঞ্জন তখনও বেকার। বেলা তখন তার বই এর প্রচারে নেমেছিল । টরন্টোয় তার শো-এর টিকিট ছিল একশো ডলার, আর সেই সাথে মিট-অ্যান্ড-গ্রিট। টিকিটের দাম জোগাড় করতে অঞ্জন কিছু ক্যাশ জব খুঁজে নিয়েছিল ।
সেই মিট এন্ড গ্রিটে একটা সময় এলো , অঞ্জনের পালা , এগিয়ে গেল, কাঁপুনে হাতে বই ধরে বেলার অটোগ্রাফের জন্য। ইচ্ছে করছিল কিছু একটা উপহার আনতে ; কেউ এনেছিল ফুল , কেউ বা নিজেদের লেখা কোনো বই বা অন্য কোনো উপহার ।
“হাই,” বেলা মিষ্টি গলায় বলে , আর অঞ্জনের মনে হয় , তার হৃদপিন্ডটা বুঝি থেমে যাবে। বেলার আঙুলে চেরিলাল নেইলপলিশ , চোখে গাঢ় আইলাইনার মাখা , আর অঞ্জন কল্পনায় ভাবে , তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়িয়ে দিতে।
“আসবার জন্য অনেক ধন্যবাদ,” বেলা বলে , বইটার সাদা পাতায় ঝটপট সই করে ।
অঞ্জন কথা বাড়াবার চেষ্টা করে, হুট করে বলে ফেলে , “আশা করি আজ রাতে ভালো কোনো হোটেলে থাকছেন। এই সব তো খুব ক্লান্তিকর , তাই না ।”
বেলা মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে তাকায় তার দিকে। “আপনি ধারণাই করতে পারবেন না "।
অঞ্জনের মাথায় তখন যেন শূন্যতা নেমে আসে । “তাহলে কোথায় থাকছেন আপনি?”
“ওই তো, কাছেই কোনো হোটেল, ম্যানেজার বুক করেছে।”
“কোনটা?”
বেলার চোখে চকিতে একটা পরিবর্তন খেলে যায় , খুব সূক্ষ্ম— চোখের ঝিলিক যেন পরে না ।
“হুম… ডাবলট্রি ইন, সম্ভবত।”
“আরে, ভালো জায়গা! ওই তো আমার বাড়ির কাছেই,” অঞ্জন বলে ফেলে , অতিরিক্ত উৎসাহে।
“হুম। ঠিক আছে, ধন্যবাদ আবার, টেক কেয়ার !” বেলা দ্রুত তাকায় তার ম্যানেজারের দিকে, যিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
***
এখন ভাবলে, নিজের ওপর রাগ হয় অঞ্জনের । সে তো কাছের মেক্সিকান রেস্তোরাঁর কথা বলতে পারত। বলতে পারত সেইন্ট লরেন্স মার্কেটের ভিন্টেজ শপগুলোর কথা, যেগুলো নিশ্চয়ই বেলা পছন্দ করত। হয়তো একটু সাহস করে বলতে পারত —আপনি আমার জীবনে যা করেছেন , তার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু না, সে ছিল লাজুক , বেখেয়াল, আর বেলা তাকেও দেখেছিল সেই একই চোখে—যেমন মহুয়া তাকে প্রতিদিন দেখে।
কালো স্ক্রিনে রঙিন কোড লাইনগুলোতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অঞ্জন নিজের মধ্যে তলিয়ে যায় । ভাবে , যদি আবার একটা সুযোগ পেতাম ! এখন তো আমি অনেক ভালো, অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী—বেলার জন্যই তো, তার পডকাস্ট কমিউনিটির জন্যই তো। সে বুঝত আমাকে, এমন করে কেউ কখনো বোঝেনি আগে । ও বলত, বন্ধুত্ব গড়া কত কঠিন হতে পারে, প্রতিদিন সকালে আয়নায় নিজেকে বলতে হয়—তুমি ঠিক আছো। বলত, প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাতে একা ঘুমানোর অদ্ভুত অনুভূতির কথা, পার্টিতে বাথরুমে নিজেকে লুকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য মুখ থেকে হাসিটা সরিয়ে নেওয়ার কথা। জেনে ভালো লাগত, যে এত সফল একজন মানুষও সমস্যায় ভোগে। তার অসম্পূর্ণতাই তাকে সম্পূর্ণ করে তুলেছে , যেমন তার একটু বাঁকা নাকটাই তাকে আরো সুন্দর করে তুলেছে । অঞ্জন একাধিকবার ইমেল করেছিল পডকাস্টে—শুধু ধন্যবাদ বলার জন্য, তার অনুভূতির কথা জানানোর জন্য। কিন্তু বেলার কাছে কখনো কোনো উত্তর পায় নি। সেই মিট-অ্যান্ড-গ্রীটের স্মৃতি যেন অঞ্জনের মাথার ভেতর আটকে আছে আটকে যাওয়া রেকর্ডের মতো। সে নিজেকে শান্ত করতে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নেয় ।
“এখনও সব ঠিক করে ফেলা সম্ভব,” নিজেকে বোঝায় সে । ভাবে একবার একেবারে মুখোমুখি দেখা হলে কেমন হয় । সে পকেট থেকে ফোন বার করে । বেলার পডকাস্টের ওয়েবসাইট খুলে দেখে সে , যেমনটা সে প্রায়ই করে। বেলার ট্যুরের সময়সূচি দেখে নেয় । আগের বার তার টাকা পয়সা ছিল না , কিন্তু এখন? প্রোগ্রামিং-এর চাকরি তাকে স্বচ্ছল করে তুলেছে। সপ্তাহান্তে যেকোনো জায়গায় উড়ে যাওয়া এখন আর স্বপ্ন নয়। তার জন্য এক হাজার ডলার খরচ করে সে যদি আসে শুধু একটা ‘ধন্যবাদ’ বলতে আর বেলা যদি এটা বুঝতে পারে , তবে নিশ্চয়ই মুগ্ধ হবে। কিন্তু তার মনটা মুষড়ে পড়ে যখন জানতে পায় , আজ রাতই বেলার ট্যুরের শেষ দিন। ঘড়ি দেখে অঞ্জন । “আমি কি এখনও ভ্যাংকুবারে পৌঁছাতে পারব?”
একটা ছুটির অজুহাত দিয়ে অফিসে না গিয়ে সরাসরি এয়ারপোর্টে দৌড়ানো সম্ভব কিনা ভেবে দেখে অঞ্জন। তবে, সৃজনীতে যোগদানের পর শুরুতে সে এতবার ছুটি নিয়েছিল, শুধুমাত্র বিছানা ছেড়ে উঠতে না পারার কারণে, অথচ এখন সে চাইছিল মিরান্ডা আর সুজিতের জন্য নির্ভরযোগ্য সহকর্মী হয়ে উঠতে।
সেই মানুষটি হও যাতে অন্যরা তোমার উপর নির্ভর করতে পারে —এই তো বেলারই কথা।
অঞ্জন অস্থির পায়চারি করতে থাকে । বেলা আগামী বছর পর্যন্ত আর ট্যুর করবে না। তার সঙ্গে এখনই যোগাযোগ করা চাই । তার মনে পড়ে যায় , সে ওষুধ ছেড়ে দিতে শুরু করেছে। কিন্তু সে বিশ্বাস করতে চায় না , এই অস্থিরতা কোনো মানসিক অসুস্থতার কারণে ঘটছে । তার মনে হয় , এটিই তার জীবনের সবচেয়ে বাস্তব অনুভূতি।
অঞ্জনের পা থেমে যায় । যদি আজ রাতেই তার শেষ শো হয়, তার মানে কয়েক দিনের মধ্যেই সে বাড়ি ফিরবে। অঞ্জনের মাথার ভেতর ভাবনার ক্যালিডোস্কোপ শুরু হয়ে যায় , তবে বেলার বাড়ি ফেরার কথা ভাবতেই প্রশান্তি বোধ হয় তার ।
ম্যানহাটন । একটা সপ্তাহান্তের সফর ম্যানহাটনে তার পক্ষে খুবই সম্ভব ।
***
ক্লান্তি নিয়ে বেলা ঘুমুতে গিয়েছিলো , নিজের বিছানাই যেন অচেনা লাগে তার । সকালে ঘরের ভেতরের রোদ দেখে সময় বোঝার চেষ্টা করে বেলা । ঘরটা মনে হচ্ছিল আগের চেয়ে ছোট, যেন আরও বেশি গুমোটে । হোটেলের বিশুদ্ধ বাতাস বা অচেনা সাদা চাদরের গন্ধ এখানে নেই। তিন মাস বাইরে থাকার পরও, এই ঘর এখনও তার নিজের গন্ধে ভরা। রাতে সে বাথরোব পরে ঘুমিয়েছিল, যদিও ম্যানহাটনের গুমোট , গরম রাতে তাপ কমেনি একটুও। বেলার হঠাৎ মনে হলো , সাথে তো কেউ নেই , পরক্ষনেই মনে হলো , অন্য কেউ না থাকুক, কাপড় তো আলিঙ্গন করে আছে। বেলা গর্ভের শিশুর মতো গুটিয়ে শুয়ে । শুয়েই উবার ইটসে খাবারের ডেলিভারির জন্য অর্ডার দেয়।
বেলার মুখ থেকে বেগেলের গুঁড়ো বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আর এর মধ্যেই পরের দুঘণ্টা বেলা শুয়ে শুয়ে ভক্তদের ইমেইল , ইনস্টাগ্রাম এর কমেন্টের উত্তর দেয় , আর ওর পডকাস্ট কমিউনিটির ফেসবুক পোস্টগুলোতে লাইক দিতে থাকে ।
কেউ একজন ইতিমধ্যেই ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে একটা সিরামিক মগ বিক্রি শুরু করেছে, যার ওপর লেখা: তোমার এলোমেলো জীবন গোছানোর এখনই সময়। বেলার প্লেলিস্ট টাও বেশ ভালোই চলছে ; লোকজন লিখেছে , এটা তাদের কতটা স্ট্রেস মুক্ত হতে সাহায্য করেছে।
***
পেন স্টেশন থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে ৩৪তম স্ট্রিটে এসে দাঁড়ায় অঞ্জন । নিউইয়র্কের শব্দ—যেন একটা স্রোত—তাকে গ্রাস করে নেয় । চারপাশে হাজারো কণ্ঠস্বর, সব ভিন্ন ভাষায়, কেউ কারোটা বুঝতে পারে না। তার মাঝখানে সাইরেন, গাড়ির হর্ণ, ডেলিভারি ট্রাকের গোঙানি ।
ঘ্রাণটাও খুব নাকে লাগে —ভাজা বাদামের মিষ্টি গন্ধ, আবার তার পাশেই খোলা আবর্জনা।
অঞ্জন হেরাল্ড স্কয়ারের এক কোনায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। ফোন বের করে । ডি লাইন ট্রেন খুঁজে বের করে ।
রাতের ফ্লাইটে সে চেক করেছিল—বেলার ইনস্টাগ্রাম। সে বাড়ি ফিরেছে কিনা। একটা প্লেন উইন্ডোর ছবি পোস্ট করেছিল বেলা — ক্যাপশনে লেখা ,: ফর গডস সেক , হোল্ড ইওর টাং ।
এক মুহূর্তের জন্য আতঙ্কে কেঁপে উঠে অঞ্জন —নিউইয়র্কের দশ মিলিয়ন লোকের মধ্যে কীভাবে খুঁজে পাবে তাকে? সে ভাবতে থাকে বেলার অফিস বা স্টুডিও কি আছে? ওর ওয়েবসাইটে খুব কম তথ্য আছে। যদি বেলার ইমেইলে ঢুকতে পারত, অনেক কিছু জেনে নিতে পারত। হ্যাক করাটা সম্ভব—তবে যখন সে জিমেইল লগইন স্ক্রিনে গিয়ে দাঁড়ায় , এক অদ্ভুত অন্ধকার অনুভূতি তাকে থামিয়ে দেয় । তার মনে হয় , এটা প্রতারণা। যেকোনো নির্বোধই ইমেইল হ্যাক করতে পারে—কিন্তু এই সফরের উদ্দেশ্য তো সহজভাবে তাকে খুঁজে বের করা নয় , বেলাকে খুঁজে বের করতে হবে মানচিত্রে কোনো এক দুর্লভ ভান্ডার বের করবার মতো। বেলার ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করতে করতে সে দেখে —একই ক্যাফের নাম বারবার আসছে। লিটল পার্ল । গুগল ম্যাপে দেখে নেয় , সেটা ডি ট্রেনের একটা স্টপের কাছেই। সঙ্গে সঙ্গে একটা মেট্রোকার্ড কিনে সে উঠে পড়ে ম্যানহাটনগামী ট্রেনে।
নিউইয়র্কে সবাই এত কাছে থাকে। মানুষের ঘামের গন্ধ, একজনের চামড়া যেন আরেকজনের গায়ে ঠেকে যায়।
ট্রেনে বসেই অঞ্জন আবার ওয়েবসাইট খুলে দেখে । একটা মাত্র ঠিকানা—একটা পি.ও. বক্স। ভক্তরা যাতে উপহার পাঠাতে পারে।
বেলা তো এখন বাড়ি ফিরেছে। অঞ্জনের ধারণা হয় , এই সময়টা সম্ভবত বেলা পোস্ট অফিসে যাবে, পুরনো চিঠিপত্র তুলতে।
পোস্ট অফিস আর ক্যাফে—দুটোই পাশাপাশি। তার মানে, দেখা পাওয়ার সুযোগ মিলে ও যেতে পারে ।
সে সিদ্ধান্ত নেয় , ক্যাফেতে ঢুকে সেই কফিটাই অর্ডার দেবে, যা বেলা বারবার পোস্ট করে—একটা লার্জ আইসড কফি , ক্রিম মেশানো ।
ঘড়িতে তখন এগারোটা । তার হাতে আছে সারা দিন।
***
বেলা দুপুরটা কাটায় তার পরের দুটো এপিসোড সম্পাদনা করে। এক পাশে একটা প্লাস্টিকের কন্টেইনারে রাখা চিকেন নুডলস , আর সে বিছানায় শুয়ে অপ্রয়োজনীয় ধ্বনি বা শব্দগুলো কেটে দিতে থাকে । একটা কলের পর, যেখানে এক কিশোর জানায় , সে কর্নেলের বদলে আফ্রিকায় যেতে চায়, সে জুড়ে দেয় 'নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই, নিশিদিন কাঁদি তাই' । আর এক নারী—বিয়াল্লিশ বছর বয়সে আবার একা হয়ে যাওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত—তার জন্য জুড়ে দেয় 'আমার মন মানে না -- দিনরজনী'।
“এটা আসলে খুবই বাজে অবস্থা, অসহনীয় ” বেলার নিজের কণ্ঠ বেজে উঠে সেই নারীর উদ্দেশ্যে—“কিন্তু আমি একটা বিষয় জানি, সেটা হচ্ছে —আমাদের হৃদয় শেষমেশ নিজে নিজেই সব গুছিয়ে নেয়। শুধু ভয়ে পড়ে কোনো মাঝারি মানের কিছু বেছে নেয়ার দরকার নেই। ডোন্ট সেটল ফর লেস ".
বেলা আবার সেই ক্লিপটা চালায় । বারবার । বিছানায় শুয়ে থাকে । তার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায় —যদি সে বেঁচে থাকত, তাহলে এখন কী রকম হতো? কেমনভাবে দিন কাটাত? সে কখনোই এমন দিনে ঘরে পড়ে থাকত না।
বেলা একটা অজুহাতের অপেক্ষায় থাকে —কোনো একটা কারণ, যাতে সে ঘর ছেড়ে বেরুতে পারে । জানালার ওপারে ম্যানহাটনের চেনা শব্দ—সেন্ট্রাল পার্কে বাচ্চাদের হাসাহাসি, সাইরেন, রাস্তায় সাইকেল চলার শব্দ—হোটেলের মৃতপ্রায় ঘরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সান্ত্বনার।
আমার অনেক চিঠিপত্র জমে আছে, বেলা ভাবে । সে ধীরে ধীরে পা টেনে বিছানা থেকে নেমে পড়ে, কাঠের মেঝের ঠাণ্ডা তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে । সে উঠে দাঁড়ায় । বাথরুমে ঢুকে মুখে হালকা মেকআপ লাগিয়ে নেয় । বাইরে বেরোনোর মতো মুখটা কিছুটা ভদ্রস্থ করা দরকার ।
***
পোস্ট অফিসে পৌঁছে বেলা তার কাঁধের ব্যাগ ভর্তি করে —পোস্টকার্ড, বুদবুদে মোড়ানো পার্সেল , ছোটখাটো উপহার। একটা পার্সেল সই দিয়ে নিতে হবে , তাই সে লাইনে দাঁড়ায় । একটু একটু করে লাইন এগোতে থাকে। কিছুটা ক্লান্তি ভর করেছে তাকে আজ ।
সে কথা বলতে চাইছে না। ছোট ছোট কথা, মিষ্টি হাসি, ভালো ব্যবহার—কিছুই ইচ্ছে করছে না তার ।
তবুও, কাউন্টারে দাঁড়ানো মিলিকে দেখে সে মাথা নেড়ে হাসে ।
“বাচ্চারা কেমন আছে?” বেলা জিজ্ঞেস করে ।
“ছোটটা এখন ওই খোলামেলা জামা পরতে শুরু করেছে। ভাবে আমি টের পাই না—জামার ভিতর দিয়ে ওর পনেরো বছরের শরীরের অনেক কিছুই বেরিয়ে আসছে ?” বেলা হেসে ফেলে । “ও ঠিক হয়ে যাবে । ওর পাশে তো আপনি আছেন।” বেলা হালকা রসিকতা করে কাটাতে চায়।
ব্যাগটা নিয়ে সে নির্জন কাউন্টারের এক কোণে গিয়ে বসে বাক্সটা খোলে । ভিতরে একটা মোমবাতি— গায়ে হাসিমুখে বেলার মুখ, দূর থেকে মনে হতে পারে খোদাই করা ।
বেলা এক মুহূর্তের জন্য ভাবে , “এই জিনিসটা নিয়ে আমি কী করব”
ঠিক তখনই তার মনে হয় কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পায় —এক তরুণী দাঁড়িয়ে, মুখে সেই পরিচিত অভিব্যক্তি।
সিক্রেট এডমাইরার —এই নামটাই মনে পড়ে বেলার । এই মুখ সে মিট-অ্যান্ড-গ্রীট-এ বহুবার দেখেছে।
ভুলভাল ফ্যাশনে মোড়া, একেবারে ব্যক্তিগত বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়া লোকজন—যারা তার কাছে এসে এক নিঃশ্বাসে সব ট্র্যাজেডি উগড়ে দেয়, আর বলে, “তুমি না থাকলে বাঁচতাম না…”, “তুমি অসাধারণ…”, “তুমি আমার জীবন বদলে দিয়েছো…”
বেলার বলতে ইচ্ছে করছিল —“আমি কিছুই নই।”
মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে , ভীতু হাসি মুখে।
এই জন্যই তো মেকআপ ছাড়া বাড়ি বের হওয়া উচিত না, মনে মনে বলে বেলা ।
"আমি দুঃখিত, বিরক্ত করলাম," বেলা কিছু বুঝে উঠার আগেই মেয়েটি শুরু করে । "কিন্তু আমি আপনাকে কথা বলতে শুনলাম, আর ভাবলাম,. আপনি কি বেলা বোস ?" বেলা ধীরে মাথা নাড়ায় ।
অবেলা বোস , বেলার মাথার ভেতর ফিসফিসিয়ে উঠে তার ষষ্ঠ শ্রেণির এক সহপাঠীর সেই পুরনো ঠাট্টা।
***
পোস্ট অফিসের ঠিক উল্টো পাশে , পার্ল ক্যাফে এর জানালা ঘেঁষে বসে আছে অঞ্জন । তার হাতে সেই কফি, যা বেলা প্রায়ই ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে —লার্জ আইসড উইথ ক্রীম । সকাল এগারোটা বাজে। বাইরে আলো ঝলমলে, রাস্তায় লোকজনের ভিড়।
কিন্তু অঞ্জনের দৃষ্টি কাঁচের ওপারে।
সে দেখেছিল —বেলা কীভাবে পোস্ট অফিসে ঢুকেছিলো । কীভাবে ব্যাগে চিঠি তুলল।
এমনকি দেখেছিল সেই মুহূর্তটাও, যখন একটা মেয়ে এগিয়ে এসে কথা বলেছিল। সে কিছু শুনতে পায়নি, কিন্তু দৃশ্যটা তার চোখের সামনে যেন নিঃশব্দ সিনেমার মতো চলছিল।
বেলাকে দেখতে অন্যরকম লাগছে আজ —অবয়ব আরো ছোট, আরো বাস্তব। তাকে দেখে মনে হয় , অতিমাত্রায় সচেতন , পডকাস্টে সারাক্ষণ যেমন মেতে থাকে, তেমন কিছু নয়, বরং অন্তর্মুখী ।
এমনই তো হওয়া উচিত—এমনটাই তো অঞ্জন কল্পনা করেছিল।
বেলা পোস্ট অফিস থেকে বের হয় , কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো , অঞ্জন উঠে দাঁড়ায় ।
তার হাত ঘেমে আছে। পিঠে ব্যাগ। গলা শুকিয়ে গেছে।
কিন্তু ভিতরটা উত্তেজনায় কাঁপছে।
এই মুহূর্তটাই আসল।
সে দরজা ঠেলে বের হয় ঠিক তখন, যখন বেলা ক্যাফের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় । এক সেকেন্ডের জন্য মনে হয় , চোখে পড়েছে তাকে।
কিন্তু না—বেলা নিচের দিকে তাকিয়ে , ফোনে স্ক্রল করছে ।
“বেলা ,” অঞ্জন ডাক দেয় । খুব নিচু গলায়। বাতাসে মিলিয়ে যাবার মতো ।
সে গলা চড়িয়ে আবার ডাকে —“বেলা !”
এইবার বেলা থামে । ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় । চোখ ঘোরায় —প্রথমে ক্যাফের দিকে, তারপর রাস্তায়।
অবশেষে তার চোখ পড়ে অঞ্জনের উপর।
প্রথমে চিনতে পারে না।
তারপর...
“ওহ,” বলল সে। ভ্রু একটুখানি কুঁচকে —খুশিতে নয়, বরং যেন মনে করার চেষ্টা করছে।
সেই দৃষ্টি, যেটা হয়ত আমরা কারও ছবি দেখি ইনস্টাগ্রামে, আর রাস্তায় হঠাৎ দেখতে পেয়ে ভেবে ফেলি, “আরে, কোথায় যেন দেখেছি…”
অঞ্জন একটু শব্দ করে হেসে উঠে । একটু নার্ভাস, একটু আশা দুরাশার দোলাচলে ।
“টরন্টো ,” মনে করাতে চায় সে। “আপনার বইয়ের ট্যুরে… আমি ছিলাম।”
বেলার মুখে এক অদ্ভুত পরিবর্তন—যেন পর্দার কিনারা বাতাসে এক মুহূর্তে কেঁপে উঠে , তারপর স্থির।
অঞ্জন একটু এগিয়ে যায় । “আমি শুধু ধন্যবাদ বলতে চেয়েছিলাম। সবকিছুর জন্য। জানি আপনি এ রকম অনেক শুনে থাকেন, কিন্তু সত্যি—”
“ভালো লাগে শুনে,” বেলা বলল। কণ্ঠস্বর নরম, কিন্তু সেই নরমটার নিচে যেন একটা প্রাচীর। তার চোখ অন্যদিকে ছুটে যাচ্ছে, যেন পালানোর রাস্তা খুঁজছে।
অঞ্জনের চেনা সেই দৃষ্টি। মহুয়ার চোখেও দেখেছে। নিজের আয়নাতেও।
“আমি উড়ে এসেছি, টরন্টো থেকে।”
একটা থমকে যাওয়া মুহূর্ত।
“আপনি উড়ে এসেছেন ?” বেলা পুনরাবৃত্তি করে ।
“হ্যাঁ। শুধু আপনাকে দেখার জন্য। কথা বলার জন্য। জানি, একটু পাগলাটে শোনাচ্ছে, কিন্তু আমি—”
“ঠিক আছে,” বেলা উত্তরে বলে হাতটা একটুখানি উপরে উঠিয়ে , উদ্দেশ্য মুহূর্তটা শান্ত করা । কণ্ঠটা নম্র, কিন্তু ভিতরে একটা সীমারেখা।
“আপনার সাপোর্টের জন্য আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু এইভাবে, কাউকে অনুসরণ করে চলে আসা… এটা ঠিক না।”
অঞ্জন স্তব্ধ হয়ে যায় । “আমি… আমি তো কেবল ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিলাম। আপনি জানেন না, আপনি আমাকে কতটা সাহায্য করেছেন। আমি এখন অনেক ভালো—আপনার জন্যই।”
বেলা মাথা নাড়ে । নিষ্ঠুর নয়, কিন্তু দয়া মেশানোও নয়। কেবল ক্লান্ত।
“ভালো লাগল শুনে,” সে বলে । “কিন্তু আমাকে এখন যেতে হবে।”
এবং বলেই, সে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে —ফিরে যায় শহরের কোলাহলে। ব্যাগটা তার কোমরের পাশে দুলতে থাকে , আর সেই মোমবাতিটার ভেতরের শব্দ টুকটুক করে বেজে উঠে —প্রতিটি পদক্ষেপে।

Comments 0
No comments yet. Be the first to comment!
Sign in to leave a comment.