গদ্য / Prose
Booklet View
শেষযাত্রা

শেষযাত্রা

Retirement

Writer
Nazmul Hasan
November 19, 2025
103
0
২২ শে নভেম্বর, ২০১৩। সকালে রহমত উল্লাহ ভাইকে নর্থ ভ্যাঙ্কুভারে লায়নস গেট হাসপাতালে দেখতে গেলাম। তিনি প্যাঙ্ক্রিয়াটিক ক্যান্সারের রোগী। শুয়ে আছেন। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছেন, আর কিছু করার নেই। তাই প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখনো তার কোন স্বজন আসেননি। জিজ্ঞেস করলাম – কেমন আছেন, রহমত ভাই?  বললেন – ওরা মরফিন দিচ্ছে, কিছু সময় আরাম লাগে, তারপর আবার ভীষণ ব্যাথা ফিল করি।  তার কাছে ঢাকার মিরপুরে তার আম বাগানের গল্প শুনলাম। বললেন নিজের উত্তরার ফ্লাটে এক মাস থেকে এসেছেন। ঢাকায় তিনি তার আম বাগানের আম খেয়ে এসেছেন। তখনও তিনি জানতেন না তার শরীরে ভয়াবহ ক্যান্সার ঘাপটি মেরে আছে। কানাডায় ফেরার পর সনাক্ত হল তিনি প্যাঙ্ক্রিয়াটিক ক্যান্সারে আক্রান্ত। সেই রহমত ভাই এখন শুধু ডাবের পানি খেতে পারেন, আর কিছু খেতে পারেন না। আমি ভ্যাঙ্কুভারের বাংলাদেশী ইঞ্জিনীয়রস অ্যাসোসিয়েশান এর চেয়ার শুনে তিনি খুশী হলেন। বললেন – ভাই, সংগঠন ধরে রাখবেন, এতে কমিউনিটি ভাইব্রেনট থাকবে। চলে আসার সময় বললেন- ডাক্তারের কথা ঠিক হলে আমি আর হয়ত পাঁচ দিন বাঁচবো। কিছু ভুলত্রুটি করলে মাফ করে দিবেন। রহমত ভাই, আপনি কমিউনিটির জন্য যা করেছেন আমরা আজীবন তা মনে রাখবো। বরং আমরা কোন ভুলত্রুটি করলে আপনি আমাদের মাফ করে দেবেন। যিনি আর পাঁচ দিন পর চলে যাবেন, তিনি কমিউনিটি ভাইব্রেনট রাখার কথা বলছেন। আশ্চর্য লাগলো। ভালো লাগল তিনি মৃত্যু চিন্তায় অস্থির নন, সাহসী বীরের মত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।
ডাক্তারের ভবিষ্যৎ বাণী মিথ্যা করে দিয়ে রহমত ভাই আরো কদিন বেঁচেছিলেন। এরপর ১৪ই ডিসেম্বর আবার দেখতে গেলাম। অশ্রু সিক্ত নয়নে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ভাবী বললেন- ভাই, উনি চলে যাচ্ছেন। ভাবী বার বার ভাইর কপাল আর গালে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। রহমত ভাইর পা থেকে কোমর পর্যন্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। হাত ছুঁয়ে দেখলাম, এখনো গরম। চোখ খোলা, কিছু দেখছেন বলে মনে হয় না। কিছু শুনছেন বলে মনে হয় না। মুখ হাঁ করে জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। বুকটা হাপরের মত উঠানামা করছে। রহমত ভাই, আপনি কি আপনার মুকুলিত আম বাগানে পাখির গান শুনছেন? আপনি কি আপনার আম বাগানের ঘ্রাণ পাচ্ছেন?  না, মা মা বলে ডাকতে ডাকতে আপনার মায়ের কাছে চলে যাচ্ছেন যে মাকে আপনি ছাত্র জীবনের শেষে এসে হারিয়েছিলেন। হ্যাঁ, তিনি চলে যাচ্ছেন। জীবনটা যেন একটা বালি ঘড়ি। এক একটি বালিকণা একেকটি মুহূর্ত। আমি চোখের সামনে বালি ঘড়িতে বালি পড়া দেখছি, আর কিছু বালি পড়া শেষ হলেই ৬৭ বছরের বালি ঘড়ি থেমে যাবে। এ সময় কিছুই বলার নেই, কিছুই করার নেই। শুধু দেখে যেতে হয়। মনে পড়ে, পড়েছিলাম Survival of the fittest। মানুষ কত অসহায়! শুধু গত দেখায় কি কথা হয়েছিল তা তার পরিবারের সদস্যদের বললাম। তারা অবাক হয়ে শুনলো। রহমত ভাইকে বিদায় জানিয়ে ভারাক্রান্ত মনে চলে আসলাম। মনে পড়লোঃ ওগো বন্ধু সেই ধাবমান কাল, জড়াইয়া ধরিল মোরে ফেলি তার জাল, তুলে নিল দ্রুত রথে……।
১৬ই ডিসেম্বর ভোরে অফিস যাওয়ার সময় ট্রেনে বসেই সাইফুজ্জামান মিঠুর ফোন পেলাম রহমত ভাই সকালে চলে গেছেন। রহমত ভাই ১৯৯২ সালে কানাডায় এসেছিলেন সপরিবারে – স্ত্রী, এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে। কানাডায় আসার আগে রহমত ভাই বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাঙ্কের কান্ট্রি ম্যানেজার ছিলেন। তার নামাজে জানাজায় থাকার জন্য অফিস থেকে ১২ টার পর বেরিয়ে সাইফুজ্জামান মিঠুর সাথে রিচমণ্ড মসজিদে গেলাম। রিচমনড মসজিদে জানাজার নামাজ হল। রহমত ভাইর সাথে আমার মাত্র তিনবার দেখা হয়েছিল। দুইবার হাসপাতালে আর একবার ভ্যাঙ্কুভার কম্যুনিটি সেন্টারের জন্য ফান্ড রেইজিং ডিনারে। ঐ এক দেখায় মনে হয়েছিল ভদ্রলোক যথার্থ ভদ্রলোক। এক আলাপে ভাল লেগেছিল। কত অচেনা মানুষ জানাজার নামাজ পড়লো। আমি তার পরিচিত লোক হয়ে দাফনে না যাই কি করে?  নামাজ শেষে সাইফুজ্জামানের গাড়িতে চিলিওয়াকের পথে রওয়ানা দিলাম। সেখানে দাফন হবে। সাথে রহমত ভাইর দুই বিদেশী বন্ধু গেলেন। এরা রহমত ভাইর চেয়ে বয়সে বড়। একজন তুরস্কের, নাম Fikret Akkurt আর এক জন মিশরের, নাম Farouk Elessiely। এরা দুজন বি,সি (ব্রিটিশ কলাম্বিয়া) মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের ট্রাস্টি।
রহমত ভাইর লাশের গাড়ির পেছন পেছন যাচ্ছি। মনে মনে বললাম, রহমত ভাই, যে কোন সময় আমরা আপনার পেছনে আসছি। ঘণ্টা দেড়েক পর রহমত ভাই কবরে যাবেন তার দীর্ঘ ঘুম ঘুমোতে। তার জীবনের সব কথা জানি না, যা জানি তা মনে পড়ছে। তিনি ভারতের নদীয়া জেলায় জন্মেছিলেন। ১৯৬২ সালে কানপুর ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ থেকে ক্যামিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং এ পাশ করেছিলেন। ভাবীর কাছে শুনেছিলাম, ভাই ইঞ্জিনীয়ারিং –এর শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন মাকে জানাতে। তিনি মা মা বলে বাড়িতে ঢুকেছিলেন। মা তার আগের দিন রাতে মারা গেছেন, তাকে জানানো হয়নি পরীক্ষা আছে বলে। মাকে আর জড়িয়ে ধরে বলা হয়নি, মা আমি ইঞ্জিনীয়ার হয়ে গেছি। মাকে হারিয়ে রহমত ভাই শোকার্ত হলেন। সেই রহমত ভাই আজ আমাদের সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন।
রহমত ভাইর বাবা-মা হয়ত ভিটামাটির মায়া ত্যাগ করে ভারত ছাড়তে পারেননি। এই মায়ার দাম কি রাজনীতিকের কাছে ছিল? যারা ৪৭ এর দাঙ্গা লাগাতে দ্বিধা করেননি তাদের কাছে এ মায়া আশা করা যায় না। তাদের উত্তরসূরিরা আজো বেঁচে আছে আর বেঁচে আছে বলেই গুজরাটে দাঙ্গা হয়েছিলো। রহমত ভাই ভারতেই বড় হয়েছেন। ১৯৬৬ সালে তিনি সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তার যাত্রা শুরু। এক সময় ইরানে একটানা দশ বছর চাকুরী করেছিলেন। এরপর গালফের আরো কটি দেশে ও আফ্রিকার সুদানে চাকুরী করেছেন। মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন; আমেরিকার ডালাসে থাকে। ছেলে কানাডায় থাকে। বাবার অসুস্থতার কথা শুনে মেয়ে ছুটে এসেছে ডালাস থেকে। বাবার যখন অন্তিম সময় এসে গেছে, কথা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন মেয়ে ছুটে এসেছে। বাবার সাথে একটিবার কথা বলার জন্য কত যে কেঁদেছে, কেঁদে কেঁদে বাবা বাবা বলে চিৎকার করেছে কিন্তু না, বাবা আর কথা বলতে পারেননি, বুঝতেও পারেননি তার আদরের মেয়েটি কাঁদছে তার সাথে একটিবার কথা বলার জন্য। এমনিই হয়, যখন তারা কথা বলতে পারেন তখন কথা শুনতে চাই না, মনে করি বড্ড বেশী কথা বলেন আর যখন চলে যান তখন কথা বলার জন্য, কথা শোনার জন্য হাহাকার করি। সন্তানের জন্য বাবা-মারা প্রতি মুহূর্তের জন্য বাবা-মা আর সন্তানের কাছে বাবা-মারা হয়ে উঠেন বিশেষ বিশেষ দিনের বাবা-মা। বাবা দিবস, মা দিবসের ঢেউ এখন বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। রহমত ভাই ভ্যাঙ্কুভারে এক রকম অবসর জীবন যাপন করতেন। না, ঠিক অবসর নয়। ভ্যাঙ্কুভারে এসে তিনি বাঙ্গালীদের জন্য একটা কম্যুনিটি সেন্টার করার কথা ভাবেন। একটা কমিটি গঠন করেন। জনে জনে চাঁদা তুলেন। একটা কম্যুনিটি সেন্টার করার জন্য প্রচণ্ড শ্রম দেন। তিনি পরপর দুইবার গ্রেটার ভ্যাঙ্কুভার বাংলাদেশ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। বাঙ্গালীর মধ্যে যা হয় তাই হল। রাজনীতি শুরু হল। প্রশ্ন উঠলো - বলা হল রহমত ভাই তো ওপারের বাঙ্গালী। বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও তিনি ওপারের বাঙ্গালী রয়ে গেলেন।  হায়রে, স্বার্থের জন্য আমরা কত ছোট ছোট আইডেনটিটি খুঁজি। এপার ওপারের কথা না হয় বাদ দিলাম। আমরা কে গোপালগঞ্জের, কে ফেনীর,  কে নোয়াখালীর এসব হিসেব করি। নদীর পাড় ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে কাদের তোলা ঢেউয়ে? কারা বানাচ্ছে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দ্বীপ? এর পরিণতি ভয়াবহ। সাদাদের রেসিসট বলি, আমরা কি কম? বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও তিনি ওপারের বাঙ্গালী হয়ে গেলেন। অভিমান করে সরে গেলেও সব সময় কম্যুনিটি সেন্টারের কাজ কতটুকু হল তার খোঁজ-খবর নিতেন। যাক, পরে এপারের বাঙ্গালীদের নিয়ে গঠিত বর্তমান কমিটি ভূল বুঝতে পেরে তাঁকে তার মৃত্যু শয্যায় লাইফ মেম্বারশিপ দিয়ে আসেন। তিনি খুশী হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে জেনে গিয়েছিলেন এপারের বাঙ্গালীরা তাকে বুকে টেনে নিয়েছে। রহমত ভাই কি ওপারকে ভুলতে পেরেছিলেন? না, তিনি তার ছেলেকে ওপারের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। নাড়ির সম্পর্ককে একেবারে ছিন্ন করতে কে পারে? যারা পারে তারা নোংরা রাজনিতীবিদ, আমরা সাধারণ জনগণ তা পারি না; ও আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা। রহমত ভাইর লাশের গাড়ির পেছন পেছন যাচ্ছি। ভাবছিলাম ইনি ব্রিটিশ ভারতের, স্বাধীন ভারতের, পাকিস্তানের, বাংলাদেশের আর সর্বশেষে কানাডার নাগরিক ছিলেন। পাঁচটি পাসপোর্টের অধিকারী রহমত ভাই আজ যে দেশে যাচ্ছেন সেখানে যেতে পাসপোর্ট লাগে না। আমার বাবার মৃত্যুর কথা মনে পড়লো। তিনিও ক্যান্সার রোগী ছিলেন। শেষের দিকের দুমাস কিছুই খেতে পারতেন না, শুধু লাল চা খেতেন আর নিউট্রিশন স্যালাইনের উপর ছিলেন। আল্লার কাছে দোয়া করতাম আল্লাহ যেন তাঁকে কষ্ট না দিয়ে তাড়াতাড়ি নিয়ে যান। এখন নিশ্চিত না – এই দোয়া তার কষ্ট কমানোর জন্য, না আমাদের কষ্ট কমানোর জন্য। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি আর বেশী দিন নেই। তার কবর তিনি বানিয়ে গেছেন। পাশে আম্মার কবর রেখেছেন। কবরের উপর হাস্নু হেনা ফুল গাছ লাগিয়েছিলেন। আজও ঐ হাস্নু হেনা গাছে ফুল ফোটে, ঘ্রাণ ছড়ায়। আমাদের ছয় ভাই-বোনের মধ্যে এক ভাই দেশে আছেন যিনি কবরের কাছে দাঁড়িয়ে বাবা-মার কবর জিয়ারত করেন। তিনিও কবে আমারিকা পাড়ি জমান ঠিক নেই। কবর জিয়ারত তো সব জায়গায় থেকে করা যায়। হ্যাঁ, করা যায়। নানা কথা ভাবতে ভাবতে চিলিওয়াকের মুসলিম কবরস্থানে এসে পড়লাম। আগে থেকে কবর প্রস্তুত করা ছিলো। কবরের নিচের দিকে প্রিকাস্ট কংক্রিটের চার দেয়াল দেয়া আছে যাতে মাটি ভেঙ্গে না পড়ে। তলায় বালির বিছানা পাতা। চমকে উঠলাম, হাসপাতালে দেখা বালি ঘড়ির সব বালি যেন কবরের তলায় এসে জমেছে।  কফিন বক্স কবরের পাশে রাখা হল। তারপর রহমত ভাইকে তার ছেলে কবরে শুইয়ে দিলেন। মনে হল ঠিক এমনি হয়ত একদিন রহমত ভাই তার নবজাতক পুত্রকে তোয়ালে মুড়িয়ে কোলে নিয়েছিলেন। লাশের কাপড়ের সব বাঁধন খুলে দেয়া হল। হ্যাঁ, আজ থেকে তিনি বন্ধন মুক্ত। রহমত ভাইর আম বাগানের সব পাখিগুলি ডানা ঝাপটে একসাথে উড়ে গেল। বন্ধন কেটে গেল তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যার সাথে, তার সাধের আম বাগানের সাথে। লাশ নামানোর সময় আমার মনে হচ্ছিলো তিনি কি মিরপুরে তার সখের আমবাগানে কবর চাননি। মৃত্যুর কমাস আগে তিনি ঢাকায় তার আম বাগানের আম খেয়ে এসেছিলেন। তার পরিবারের কাছে শুনেছি তিনি ভ্যাঙ্কুভারে কবর চেয়েছিলেন। আমার মনে হচ্ছিল ছেলেমেয়ের কষ্টের কথা ভেবে তিনি হয়ত ভ্যাঙ্কুভারেই কবর চেয়েছেন, হয়ত বা স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ের কাছে থাকতে চেয়েছেন। বাবা-মারা বোধ হয় এমনই হন। এরপর কংক্রিটের ওয়ালের উপর ছোট ছোট স্ল্যাবের টুকরা বসানো হল। সবাই মিলে কবরে মাটি দিলাম। রহমত ভাইর কবরের কাছেই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার রফিক ভাইর কবর। তিনি ব্লাড ক্যান্সারে গত ২০শে নভেম্বর মারা গিয়েছিলেন। রফিক ভাই ১৯৯৫ সালে কানাডায় এসেছিলেন। আমার আশ্চর্য লাগে, যে মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীন করেছেন, যে দেশের মাটিতে মওলানা ভাসানী শুয়ে আছেন, যে দেশের মাটিতে শেখ মুজিবর রহমান শুয়ে আছে, যে দেশের মাটিতে কবি নজরুল শুয়ে আছেন, যে দেশের মাটিতে বাঘা যতীন, প্রীতিলতা জন্মেছেন, তিনি কেন সেখানে যেতে চাননি। সরকার তো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দেশে কবর দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।  রহমত ভাইও বা কেন তার প্রিয় আম বাগানে যেতে চাননি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কোন কুল-কিনারা পাই না। ভারাক্রান্ত মনে রহমত ভাইকে একা ফেলে ভ্যাঙ্কুভারের দিকে রওয়ানা দিলাম। এক সময় আমরা সবাই চূড়ান্তভাবে নিঃসঙ্গ হবো। তাই বাবা –মা যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন আমাদের সাথে থাকুন, আলাদা থাকবেন কেন? যখন দেখি সাইফুজ্জামান মিঠু তার আশীতিপর বৃদ্ধা মাকে ভ্যাঙ্কুভারে এনে সাথে রেখেছেন তখন খুব ভালো লাগে; একটা অদ্ভূত অনুভূতি জাগে – মনে হয় আমার মাকে আমি সাথে রেখেছি। আমার মা আজ আর বেঁচে নেই; পনের বছর বাবার কবর পাহারা দিয়ে তিনিও গত হয়েছেন। দোয়া করি আমাদের সন্তানরা যেন সাইফুজ্জামান মিঠুর মত হয়।
গাড়ি রিচমনডের দিকে চলছে। কানে হেমন্তের গান বাজেঃ যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে, চুকিয়ে দেব বেচাকেনা, মিটিয়ে দেব গো লেনাদেনা, বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে।  আমাদের গাড়িতে আগেই বলেছি দুজন বিদেশী বৃদ্ধ ছিলেন। তাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হল। তারা দুজন রহমত ভাইর চেয়ে বয়সে বড়। কত বড় জানি না। মনটা হাল্কা করার জন্য ফিক্রেত সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম – আপনি কবে কানাডায় এসেছেন? বললেন – আমি ১৯৫২ সালে পাইলট-এর ট্রেনিং নিতে আসি। তারপর ১৯৫৬ সালে তুরস্ক থেকে কানাডায় এসে সেটেল করি। তার মানে আমার জন্মের আগে। আমার কৌতূহল আমাকে থামাতে পারেনি। আমি বয়স জানতে চাইলাম। তিনি বললেন – তার বয়স এখন তিরাশি। ফারুক সাহেব শুনে হেসে উঠলেন। বললেন – আমি এখনও ইয়ং, ওর জুনিয়র। বলেই আবার হাসলেন। বললেন –আমার বয়স মাত্র সাতাত্তুর। আমি যতটা ভারাক্রান্ত হয়েছি, এই দুই বৃদ্ধ তা হননি। তারা যে কষ্ট পাননি তা নয়। এ দুজন এসেছেন তাদের বন্ধুকে সমাধিস্ত করতে। এদের চেয়ে বড় বন্ধু আর কে হতে পারে? বন্ধু কি বুঝবে তার কোন বন্ধু শেষ যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন? রহমত ভাইর শেষ যাত্রার সঙ্গী দুই বৃদ্ধ মৃত্যু ভয়ে ভীত নন। যে কদিন বেঁচে থাকবেন হাসবেন, আনন্দে থাকবেন; মরার আগে মরবেন না। এ দুজন আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। মরার আগে মরা খুব খারাপ। মৃত্যুর প্রস্তুতি থাকলে মৃত্যুকে মোকাবিলা করা সহজ। জীবন তো একটা খাতা- উপরের মলাট জন্ম আর শেষ মলাট মৃত্যু, মাঝের পাতাগুলো জীবন কাহিনী। আত্মত্যাগের কাহিনী, মহান কাহিনী, জনসেবার কাহিনী আমাদের অমরত্ব দিবে, মুক্তি দিবে। মৃত্যুই জীবনের শেষ নয়। আমরা বেঁচে থাকতে খুব ভালবাসি। জান্নাতে যেতে চাই, তবে মরতে চাই না। আল্লাহপাক জানেন মানুষ বেঁচে থাকতে ভালবাসেন। তিনি আমাদের রিজারেকশনের কথা শোনান। আমরা বলি আমরা আমাদের সন্তানদের মাঝে বেঁচে থাকব। কেউ বলে কীর্তির মাঝে বেঁচে থাকো। রবি গুরুও শোনালেন অমরত্বের কথাঃ তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি, সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি-আহা, নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহুডোরে, আসবো যাবো চিরদিনের সেই আমি। এখন বিজ্ঞানও শোনাচ্ছে অমরত্বের কাহিনী। এসব অমরত্বের কাহিনী আমাদের সাহস জোগায়; মৃত্যুকে কিসের ভয়। গাড়ীতে দুই বৃদ্ধের প্রাণখোলা কথাবার্তা মনে সাহস এনে দিল। জিজ্ঞেস করলাম তাদের দীর্ঘায়ুর রহস্য। ফারুক সাহেব উত্তর দিলেন – regular prayer, no junk food, and no white lady. One woman is more than enough. এই দুঃখের মধ্যেও না হেসে পারলাম না। আমার মনে হল দুই তরুণ আমাদের মাঝে বসে আছে, আমরাই বৃদ্ধ। রিচমনড মসজিদে ফিরে এলাম। বন্ধুকে চিলিওয়াকের সাড়ে তিন হাত বাসায় রেখে দুজন বৃদ্ধ আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে তাদের নিজ নিজ গাড়ীতে উঠলেন। মাদার তেরেসা বলেছিলেন – Life is a song, sing it. হ্যাঁ, তারা জীবনের গান গাইতে গাইতে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। আমরাও ভ্যাঙ্কুভারের দিকে রওয়ানা দিলাম। কিচ্ছুক্ষন পরেই গিন্নীর ফোন পেলাম। তোমরা কোথায়? দেরী হবে নাতো? মনে আছে আজ রাতে জন্মদিনের দাওয়াত। বললাম –হ্যাঁ, মনে আছে। আর মিনিট বিশ পরে বাসায় ফিরবো। বেমালুম ভুলে গেলাম আমার বালি ঘড়ির বালিও নিরবিচ্ছন্নভাবে ঝরে পড়ছে। কানে ভাসছে হেমন্তের গাওয়া ঐ গান –
তখন এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে, কাটবে দিন কাটবে, কাটবে গো দিন আজও যেমন দিন কাটে, আহা ঘাটে ঘাটে খেয়ার তরী এমনি সেদিন উঠবে ভরি- চরবে গোরু খেলবে রাখাল এই মাঠে।
সমাপ্ত


Comments 0

No comments yet. Be the first to comment!

📢 Proudly Supported By

Advertisement

Advertisement